মাটি কাকে বলে

মাটি সংক্রান্ত

মাটি কাকে বলে:

পৃথিবীর উপরিভাগের যে নরম স্তরে গাছপালা মূল স্থাপন করে রস শোষণ করে জন্মায় ও বৃদ্ধি পায় তাকে মাটি বলে।

মাটির গুণাগুণ:

পৃথিবী পৃষ্ঠের যে অংশ থেকে উদ্ভিদ খাদ্য সংগ্রহ করে তাই মাটি। পুকুরের পানি সংলগ্ন ১৫-২০ সেমি. মাটি পানির সাথে ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়ায় সরাসরি অংশ নিয়ে থাকে। মাটি ও পানির গুণাগুণের ওপরই মাছের উৎপাদন প্রাথমিকভাবে নির্ভর করে। কোন জলাশয়ের পানি ধারণের আধার হলো মাটি। ভাল মাটিতে যেমন ভাল ফসল হয় ঠিক তেমনি ভাল মাটির পুকুরেও মাছের ভাল উৎপাদন পাওয়া সম্ভব। জলাশয়ের উৎপাদন ক্ষমতা প্রাথমিকভাবে মাটির ধরনের ওপর নির্ভর করে। উর্বর মাটিতে খনন করা পুকুরে সাধারণভাবে মাছের উৎপাদনও ভাল হয়। উর্বর মাটির পুকুর মাছের প্রাকৃতিক খাদ্য তৈরির জন্য অধিক পরিমাণে প্রয়োজনীয় পুষ্টির যোগান দেয়। সুতরাং মাছ চাষে মাটির গুণাগুণের গুরুত্ব অপরিসীম।

মাছ চাষের ক্ষেত্রে মাটি ও পানির ভৌত-রাসায়নিক গুণাগুণ অন্যতম ভূমিকা পালন করে থাকে। মাছ তার জীবন ধারণের সব কাজ পুকুর-জলাশয়ের পানির মধ্যেই সম্পন্ন করে থাকে। এসব কার্যাদি সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের জন্য পুকুরের বা জলজ পরিবেশের বিভিন্ন গুণাবলী যথাযথ মাত্রায় নিয়ন্ত্রণ ও ব্যবস্থাপনা করা প্রয়োজন।

কোন জলাশয়ের পানি ধারণের আধার হলো মাটি। মাটিতে বিদ্যমান বিভিন্ন উপাদান পানির ভৌত রাসায়নিক গুণাগুণ নিয়ন্ত্রণ করে। অর্থাৎ কোন জলাশয়ের উৎপাদন ক্ষমতা প্রাথমিকভাবে ঐ জলাশয়ের মাটির ধরনের ওপর নির্ভর করে। বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে লাভজনকভাবে মাছ চাষের জন্য প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর জলজ পরিবেশ এবং পানিতে প্রাকৃতিক খাদ্যের পরিমিত প্রাচুর্যতা। পানির প্রাথমিক উৎপাদন ক্ষমতা প্রধানত মাটির ভৌত রাসায়নিক গুণাগুণ তথা মাটির উর্বরতার ওপর নির্ভর করে।

মাটি হলো ভূপৃষ্ঠের উপরিতলের নরম খনিজ এবং জৈব উপাদানের মিশ্রণ যা উদ্ভিদের বৃদ্ধির জন্য প্রাকৃতিক মাধ্যম হিসেবে কাজ করে। মাটি প্রধানতঃ ৪ টি প্রধান উপাদান সমন্বয়ে গঠিত। এগুলো নিচে উল্লিখিত হলোঃ

stagnogley

১। খনিজ পদার্থ – ৪৫%;

২। জৈব পদার্থ – ৫%;
৩। বায়ু – ২৫ %;
৪। পানি – ২৫%;

সুতরাং মাটি কঠিন, তরল এবং গ্যাসীয় এই তিন ধরণের পদার্থের সমন্বয়ে গঠিত। নিচে মাটির বিভিন্ন উপাদানের সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করা হলোঃ

খনিজ পদার্থ ভূ-ত্বক প্রথমে শিলা দ্বারা গঠিত ছিল। পরে তা শিলা ক্ষয় প্রক্রিয়ায় ভেঙ্গে ছোট খন্ডে বা এককে রূপান্তরিত হয়। মাটির এই অংশ বালি, পলি ও কর্দম কণা দ্বারা গঠিত। শিলা ক্ষয় প্রক্রিয়ার ফলে উপরোক্ত কণা ও অত্যাবশ্যকীয় খাদ্যোপাদান যেমন- নাইট্রোজেন, ফসফরাস, পটাশিয়াম, ক্যালশিয়াম এবং অন্যান্য পুষ্টি উপাদান মাটিতে মুক্ত হয়। মাটিতে খনিজের পরিমাণ হলো ৪৫%।

জৈব পদার্থ মাটিতে ১-২% জৈব পদার্থ থাকে তবে হিম অঞ্চলের মাটি ২-৫% জৈব পদার্থ ধারণ করে। এই সব জৈব পদার্থ উদ্ভিদ ও প্রাণীর অবশিষ্টাংশ ও মলমূত্র হতে মাটিতে আসে। জৈব পদার্থ মাটির আবদ্ধকরণ পদার্থ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মাটিতে জৈব পদার্থের পরিমাণ খুব কম হলেও এটি ব্যাপকভাবে মাটির গুণাবলী নিয়ন্ত্রণ করে থাকে।

জৈব পদার্থ নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে-

সমস্ত পুষ্টি উপাদানের গুদাম ঘর হিসেবে কাজ করে;
মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈব গুণাবলী উন্নত করে;
ভূমি ক্ষয় রোধ করে;

অতিরিক্ত শ্বসন অঙ্গ থাকায় এসব মাছ বাতাস থেকে অক্সিজেন নিয়ে বেঁচে থাকতে পারে; ফলে জীবন্ত অবস্থায় বাজারজাত করা যায়;

পানি ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে;

অণুজীবের প্রধান শক্তি হলো এই জৈব পদার্থ এবং

মাটিতে নাইট্রোজেনের প্রধান উৎস এ জৈব পদার্থ।

বায়ু ও পানি প্রবল বর্ষার সময় বা সেচ দিলে মাটির অধিকাংশ রন্ধ্রই পানি দ্বারা পূর্ণ হয়। কিন্তু শুকনা বা খরার সময় ঐ রন্ধ্রগুলো বায়ু দ্বারা পূর্ণ হয়। বায়ুমন্ডলের বায়ু অপেক্ষা মাটির বায়ুতে বেশি পরিমাণ কার্বন ডাই-আক্সাইড ও জলীয়বাষ্প থাকে কিন্তু অক্সিজেনের পরিমাণ কম থাকে। বায়ুর প্রধান কাজ হলো শ্বসন প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করা। বায়ু ও পানির গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো-

মাটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক কার্য নিয়ন্ত্রণ করা;
শিলা ক্ষয় প্রক্রিয়ায় সাহায্য করা;
সালোকসংশ্লেষণ পদ্ধতিতে অংশগ্রহণ করা এবং
দ্রাবক ও পুষ্টি উপাদানের বাহক হিসেবে কাজ করা।

মাটির প্রকারভেদ:

বালি, পলি ও কাদা- এই তিনটি স্বতন্ত্র মাটি কণার তুলনামূলক অনুপাতের ওপর ভিত্তি করে মাটির বুনটসমূহের নামকরণ করা হয়েছে। বিভিন্ন মাটি বিভিন্ন অনুপাতে বালি, পলি ও কাদা কণা ধারণ করে থাকে। কোন মাটিতে বালি কণার পরিমাণ বেশি, আবার কোনটাতে কাদা কণার পরিমাণ বেশি। এই পরিবর্তনের নির্দিষ্ট সীমারেখায় রেখে মাটিকে ১২ টি গ্রুপ বা দলে বিভক্ত করা হয়। এই দলগুলোই বুনটভিত্তিক শ্রেণী বলে পরিচিত। এই শ্রেণীগুলোর একটির হতে অন্যটির ভৌত, রাসায়নিক ও জৈবিক ধর্মে যথেষ্ট পার্থক্য পরিলক্ষিত হয়। যে মাটিতে অধিক পরিমাণ কাদা কণা থাকে তাকে কাদা মাটি, যে মাটি অধিক পরিমাণ পলি কণা ধারণ করে তাকে পলি মাটি, আর যে মাটিতে বালি কণার পরিমাণ বেশি থাকে তাকে বালি মাটি বলে। যদি কোন মাটি এই তিনটি শ্রেণীর একটিরও প্রভাব বিস্তারকারী ভৌতিক বৈশিষ্ট্য প্রদর্শন না করে (যেমন-৪০% বালি কণা, ২০% কাদা কণা ও ৪০% পলিকণা যুক্ত মাটি) তবে তাকে দোআঁশ মাটি বলে। দোয়াঁশ মাটিতে বালি, পলি ও কাদা কণার শতকরা পরিমাণ সমান থাকেনা। কিন্তু এ বালি, পলি ও কাদা কণাসমূহের কাছাকাছি প্রায় সামঞ্জস্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য বা ধর্ম প্রদর্শন করে।

মাটির গুণাগুণ:

সুষ্ঠুভাবে মাছ চাষ ব্যবস্থাপনায় পুকুর তৈরির জন্য দোঁআশ ও বেলে-দোঁআশ মাটি সবচেয়ে ভাল। এ ধরনের মাটি সহজে পানি ধারণ করে রাখতে পারে। মাটির পিএইচ (PH)-এর মাত্রা ৫.০ এর উপরে থাকা সমীচীন। মাটিতে বিদ্যমান পুষ্টি পদার্থ ও পিএইচ-এর ওপর ভিত্তি করে মাটিকে সাধারণতঃ ৩ ভাগে ভাগ করা যায়। যেমন- উচ্চ উৎপাদনশীল, মধ্যম উৎপাদনশীল ও নিম্ন উৎপাদনশীল (সারণি-১)।

সারণি-১: মাটির পুষ্টিমান ও পিএইচ অনুযায়ী পুকুর-জলাশয়ের শ্রেণিবিন্যাস উৎপাদনশীলতার শ্রেণী পিএইচ মাত্রা পুষ্টি উপাদানের মাত্রা (মিগ্রা/কিলো) নাইট্রোজেন ফসফরাস কার্বন উচ্চ ৭.৫-৬.৫ >৫০ ৬-১২ >১.৫ মধ্যম ৬.৫-৫.৫ ২৫-৪৯ ৩-৫ >০.৫-১.৪ নিম্ন <৫.৫ <২৫ <৩ <০.৫

প্রাকৃতিক উৎপাদনশীলতা কম হলেও সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে লাভজনক মাছ চাষের জন্য পুকুরকে উপযোগি করে তোলা যায়। এক্ষেত্রে খরচ কিছুটা বেশি পড়ে।

মাটির গঠন, বর্ণ, পিএইচ-র ওপর ভিত্তি করে বাংলাদেশের মাটিকে সাধারণভাবে ৬ ভাগে ভাগ করা যায়। এ ভিত্তিতে বাংলাদেশের মাটির শ্রেণিবিন্যাস ও প্রাকৃতিক উৎপাদনশীলতা নিচের সারণিতে দেয়া হলো (সারণি-২)।

সারণি-২: অঞ্চলভেদে মাটির গুণাগুণ

ক্র.নং অঞ্চল মাটির প্রকার PH-র ভিত্তিতে মাটির ধরণ মাটির বর্ণ উৎপাদনশীলতা ১ বরেন্দ্র, মধুপুর গড়, সাভার, গাজীপুর, সিলেট, কুমিল্লা ও নোয়াখালীর অংশ বিশেষ এটেল, কাদা ও বালিযুক্ত কাদা বেশি অম্লীয় লাল ও বাদামী প্রাকৃতিক উৎপাদনশীলতা কম ২ যশোর, ফরিদপুর, কুষ্টিয়া, পাবনা, রাজশাহী, ঢাকা ও বরিশালের কিয়দংশ পলিযুক্ত এটেল ক্ষারীয় হালকা ও বাদামী গাঢ় ধূসর প্রাকৃতিক উৎপাদনশীলতা বেশি ৩ ময়মনসিংহ, টাঙ্গাইল, সিলেট, কুমিল্লা, নোয়াখালী, ঢাকা, রংপুর, বগুড়া, পাবনা ও ফরিদপুরের কিয়দংশ পলিযুক্ত দো-আঁশ নিরপেক্ষ থেকে ক্ষারীয় ধূসর ও গাঢ় ধূসর প্রাকৃতিক উৎপাদনশীলতা তুলনামূলক বেশি ৪ রংপুর-দিনাজপুরের কিয়দংশ, মানিকগঞ্জ, গাইবান্ধা, ফরিদপুর ও টাঙ্গাইলের কিয়দংশ বালি ও বালিযুক্ত পলি কিছুটা অম্লীয় ধূসর প্রাকৃতিক উৎপাদনশীলতা তুলনামূলক কম ৫ নদী সন্নিকটস্থ অঞ্চল বালিযুক্ত পলি অম্লীয়/ক্ষারীয়/নিরপেক্ষ ধূসর থেকে কালচে ধূসর প্রাকৃতিক উৎপাদনশীলতা তুলনামূলক কম ৬ উপকূলীয় অঞ্চলসমূহ পলি ও কাদার ভাগ বেশি অম্লীয় কালো বা ছাই রং প্রাকৃতিক উৎপাদনশীলতা কম

মাটির ভৌত-রাসায়নিক গুণাগুণ:

যে অঞ্চলের মাটি উর্বর সে স্থানে খনন করা পুকুরও সাধারণভাবে উর্বর হয়ে থাকে এবং সে অঞ্চলের পুকুরে মাছের উৎপাদনও ভাল হয়। উর্বর মাটি পানিতে মাছের প্রাকৃতিক খাদ্যের যোগান দেয় এবং পানি দূষণ রোধে ভূমিকা রাখে। সাধারণভাবে মাটি ৪ প্রকারের হয়ে থাকে ক) এটেল মাটি, ২) বেলে মাটি, গ) লাল মাটি এবং ঘ) দোআঁশ মাটি। দোআঁশ মাটির পুকুর মাছ চাষের জন্য সর্বাধিক উপযোগি। বেলে মাটির পানি ধারণক্ষমতা খুবই কম এবং লাল মাটির পুকুরে পানি প্রায় সবসময় ঘোলা থাকে। এজন্য বেলে মাটি ও লাল মাটিতে খনন করা পুকুর মাছ চালের জন্য ততটা উপযোগি হয় না। বিভিন্ন ধরণের পুষ্টি ধরে রাখা ও আদান প্রদানে দোআঁশ মাটি উত্তম।

দোআঁশ মাটি মাছ চাষের জন্য উত্তম;
এটেল মাটি মাছ চাষের জন্য কম উপযোগি;
বেলে মাটি চাষ চাষের উপযোগি নয়;
লাল মাটিতে মাছচাষ ব্যয়বহুল।

ভালো মানের মাটির জন্য যোগাযোগ করুন – ০১৯৮৬২০২৫৮৫

শীতকালীন রোগবালাই ও প্রতিকার

গবাদি পশু-পাখির শীতকালীন রোগবালাই ও প্রতিকার

আসছে শীতকাল। এ সময় গরু ছাগল, হাঁস-মুরগিসহ অন্যান্য গবাদিপশু-পাখির নানান রকমের রোগবালাই হয়ে থাকে। গবাদিপশু পাখির শীতকালীন কিছু কমন রোগের চিকিৎসা পদ্ধতি নিজের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতার আলোকে তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্যাথলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. প্রিয় মোহন দাস।

গামবোরো রোগ
গামবোরো একটি ভাইরাসজনিত রোগ। এ রোগে বাংলাদেশে প্রচুর পরিমাণে ব্রয়লার, কক, সোনালী ও লেয়ার মুরগি মারা যায়। তাই এ রোগের মুরগির মৃত্যুর পাশাপাশি আক্রান্ত ফ্লক ইম্যুনোসাপ্রেশনে ভোগে। আর তাই এ রোগকে মুরগির এইডস বলা হয়। আর এ ধরনের ফ্লক থেকে কখনই আশানুরূপ ফলাফল পাওয়া যায় না।
রোগের লক্ষণ
গামবোরো রোগের কিছু কমন লক্ষণ হলো পানি না খাওয়া, খাদ্য না খাওয়া, পাতলা পায়খানা হওয়া ইত্যাদি।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
এন্টিবায়োটিক হিসেবে সিপ্রোফ্লক্সাসিন ১০% ব্যবহার করা যায়। এটি রক্তে তাড়াতাড়ি মিশে আর শরীরে থাকেও দীর্ঘক্ষণ। ফলে দ্রুত কাজ শুরু হয়ে যায়। ১ লিটার পানিতে ১ মিলি পরপর ৩-৫ দিন সবসময়ের জন্য পানিতে দিতে হবে। যে কোনো ভালো অর্গানিক এসিড কোম্পানি নির্দেশিত মাত্রায় ব্যবহার করা যেতে পারে। অর্গানিক অ্যাসিডগুলো কিডনি হতে ইউরেট দূর করতে সহায়তা করে। এ ক্ষেত্রে ভিনেগার ব্যবহার করা যায়।
গলাফুলা রোগ
গলাফুলা (hemorrhagic septicemia) এশিয়া, আফ্রিকা, দক্ষিণ ইউরোপের কিছু দেশ ও মধ্যপ্রাচ্যে বিদ্যমান। তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় এটি বেশি পরিলক্ষিত হয়। গলাফুলা একটি তীব্র প্রকৃতির রোগ যা গরু এবং মহিষকে আক্রান্ত করে। এটি একটি ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ, যা Pasteurella multocida দ্বারা সংঘটিত হয়। এ রোগে মৃত্যুর হার খুবই বেশি।
পশুর শরীরে স্বাভাবিক অবস্থায় এ রোগের জীবাণু বিদ্যমান থাকে। কোনো কারণে যদি পশু ধকল যেমন ঠাণ্ডা, অধিক গরম, ভ্রমণজনিত দুর্বলতা ইত্যাদির সম্মুখীন হয় তখনই এ রোগ বেশি দেখা দেয়। গলাফুলা রোগের প্রচলিত নাম ব্যাংগা, ঘটু, গলগটু, গলবেরা ইত্যাদি।
রোগের লক্ষণ
এ রোগ অতি তীব্র ও তীব্র এ দুইভাবে হতে পারে।
অতি তীব্র প্রকৃতির রোগে হঠাৎ জ্বর হয়ে মুখ ও নাক দিয়ে তরল পদার্থ বের হতে থাকে। পশু অবসাদগ্রস্ত হয়ে পড়ে ও খাওয়া বন্ধ করে দেয় এবং ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মৃত্যু ঘটে। তীব্র প্রকৃতির রোগে আক্রান্ত পশু ২৪ ঘন্টার অধিক বেঁচে থাকে। এ সময় পশুর এডিমা দেখা দেয় যা প্রথমে গলার নিচে, পরে চোয়াল, তলপেট এবং নাক, মুখ, মাথা ও কানের অংশে বিস্তৃত হয়।
গলায় স্ফীতি থাকলে গলার ভেতর ঘড় ঘড় শব্দ হয়, যা অনেক সময় দূর থেকে শোনা যায়। প্রদাহযুক্ত ফোলা স্থানে ব্যথা থাকে এবং হাত দিলে গরম ও শক্ত অনুভূত হয়। মুচ দিয়ে ছিদ্র করলে উক্ত স্থান হতে হলুদ বর্ণের তরল পদার্থ বের হয়ে আসে। অনেক সময় কাশি হয় এবং চোখে পিচুটি দেখা যায়। নাক দিয়ে ঘন সাদা শ্লেষ্মা পড়তে দেখা যায়। সাধারণত লক্ষণ প্রকাশ পাওয়ার ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে শ্বাসরুদ্ধ হয়ে আক্রান্ত পশু মারা যায়।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
আক্রান্ত পশুর চিকিৎসায় বিলম্ব হলে সুফল পাওয়া যাবে না। তাই রোগের উপসর্গ দেখা দেয়ার সাথে সাথে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। এ রোগের চিকিৎসায় Ampicillin, Tetracycline, Erythromycin, Sulphonamide জাতীয় ইনজেকশন গভীর মাংসে দিয়ে ভালো ফল পাওয়া যায়।
এ রোগ উচ্ছেদ করা অসম্ভব কারণ এ রোগের জীবাণু স্বাভাবিক অবস্থায় পশুর দেহে থাকে। তবে নিম্নোক্ত ব্যবস্থা অবলম্বন করে এ রোগ প্রতিরোধ করা যায়।
  • রোগাক্রান্ত পশুকে সুস্থ পশু থেকে আলাদা করে সুস্থ পশুকে টিকা দানের ব্যবস্থা করতে হবে।
  • মড়কের সময় পশুর চলাচল নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে।
  • হঠাৎ আবহাওয়া পরিবর্তনের ক্ষেত্রে পশুর পরিচর্যার ব্যবস্থা করতে হবে।
  • টিকা প্রয়োগের মাধ্যমে রোগ নিয়ন্ত্রণ করা যেতে পারে।
ক্ষুরারোগ
এটি ভভইরাসজনিত একটি মারাত্মক সংক্রামক ব্যাধি। দুই ক্ষুরওয়ালা সব প্রাণীই এ রোগে আক্রান্ত হতে পারে। তবে আমাদের দেশে সাধারণত গরু, ছাগল, মহিষ ও ভেড়া এ রোগের শিকার হয় বেশি। বাতাসের সাহায্যে এ রোগের ভাইরাস দূরবর্তী এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে।
রোগের লক্ষণ
  • প্রথম অবস্থায় শরীরের তাপমাত্রা বৃদ্ধি পায়।
  • মুখ দিয়ে লালা ঝরে এবং লালা ফেনার মতো হয়। পশু খেতে পারে না এবং ওজন অনেক কমে যায়।
  • দুগ্ধবতী পশুতে দুধ অনেক কমে যায়। বাছুরের ক্ষেত্রে লক্ষণ দেখা দেয়ার আগেই বাছুর মারা যেতে পারে।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
আক্রান্ত প্রাণীর মুখ ও পায়ের ঘা পটাশিয়াম পারম্যাংগানেট মেশানো পানি বা খাওয়ার সোডা মেশানো পানি দিয়ে দিনে ৩-৪ বার ধুয়ে দিতে হবে। ওষুধ মেশানো পানি দিয়ে ক্ষতস্থান ধোয়ার পরে সালফা নিলামাইড বা এ ধরনের পাউডার লাগাতে হবে। চার ভাগ নারকেল তেলের সাথে ১ ভাগ তারপিন তেল মিশিয়ে লাগালে ক্ষতস্থানে মাছি পড়বে না।
গরুর বাদলা রোগ
বাদলা রোগ গরুর ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ। ক্লস্ট্রিডিয়াম শোভিয়াই নামক ব্যাকটিরিয়া জীবাণু এ রোগের প্রধান কারণ-
রোগের লক্ষণ
  • তীব্র রোগে প্রথমে জ্বর হয় ও শরীরের বিভিন্ন স্থানে বিশেষ করে পেছনের অংশে মাংসপেশি ফুলে যায়।
  • ফোলা জায়গায় চাপ দিলে পচ পচ শব্দ হয়।
  • আক্রান্ত অংশ কালচে হয়ে যায় ও পচন ধরে।
  • রোগাক্রান্ত প্রাণী দুর্বল হয়ে মারা যায়।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
অ্যান্টিব্লাকলেগ সিরাম প্রতিটি আক্রান্ত পশুর শিরা বা ত্বকের নিচে ১০০-২০০ মিলিলিটার ইনজেকশন দিতে হবে (যদি পাওয়া যায়)  অ্যান্টিহিসটামিনিক জাতীয় ইনজেকশন যেমন- হিস্টাভেট, ডিলারজেন, ফ্লুগান ইত্যাদি দৈনিক ৬ সি.সি. করে ৩ দিন মাংসে ইনজেকশন দিতে হবে। প্রয়োজনে আক্রান্ত ক্ষতস্থান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে পরিষ্কার করে টিংচার আয়োডিন গজ প্রয়োগ করতে হবে।
আক্রান্ত পশুকে সুস্থ পশু থেকে আলাদা করে চিকিৎসার ব্যবস্থা করতে হবে। মৃত পশুকে মাটির নিচে কলিচুন সহযোগে পুঁতে ফেলতে হবে। জীবাণুনাশক দিয়ে গোয়ালঘর পরিস্কার করতে হবে।
ফ্যাসিওলিয়াসিস রোগ
গবাদিপশুর যকৃতে ফ্যাসিওলা জাইগানটিকা ও ফ্যাসিওলা হেপাটিকা নামক পাতাকৃমি দ্বারা সৃষ্ট পশুর রোগকে ফ্যাসিওলিওসিস বলে। রক্তস্বল্পতা, ম্যান্ডিবুলের নিচে পানি জমা, যা দেখতে বোতলের মতো, ডায়রিয়া এবং ধীরে ধীরে কৃশকায় অবস্থায় পরিণত হওয়াই এ রোগের বিশেষ বৈশিষ্ট্য। বাংলাদেশে প্রায় ২১ ভাগ গরুতে এবং সিলেট অঞ্চলে প্রায় ২১.৫৪ ভাগ ছাগলে ফ্যাসিওলা জাইগানটিকা পাতাকৃমিতে হয়।
রোগের লক্ষণ
  • আক্রান্ত পশুর যকৃতে অপ্রাপ্তবয়স্ক কৃমির মাইগ্রেশনের ফলে যকৃত কলা ধ্বংস হয় এবং যকৃতিতে প্রোটিন সংশ্লেষণ হ্রাস পায়। এতে পশুর হাইপোপ্রিটিনিমিয়া তথা বটল জ্বর হয়।
  • বদহজম ও ডায়রিয়া দেখা দেয়। ক্ষুধামন্দা ও দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয়। চোখের কনজাংটিভা ফ্যাকাশে হয়ে যায়।
  • তীব্র যকৃত প্রদাহ এবং রক্তক্ষরণের ফলে লক্ষণ প্রকাশের আগেই পশুর হঠাৎ মৃত্যু ঘটে।
চিকিৎসা ও প্রতিকার
ট্রাইক্লেবেন্ডাজল বোলাস প্রতি কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ১০ থেকে ১৫ মিলিগ্রাম করে আক্রান্ত পশুকে খাওয়ালে ৯০ থেকে ১০০ ভাগ সুফল পাওয়া যায়। নাইট্রোক্সিলিন ইনজেকশন প্রতি ৫০ কেজি দৈহিক ওজনের জন্য ১.৫ মিলিলিটার হিসেবে গরু, মহিষ ও ছাগলের ত্বকের নিচে প্রয়োগ করে কার্যকরি ফল পাওয়া যায়। সহায়ক চিকিৎসা হিসেবে দুর্বলতা ও রক্তস্বল্পতার জন্য ভিটামিন বি-কমপ্লেক্স ইনজেকশন দেয়া এবং মিনারেল মিকচার খাওয়ানো ভালো। পশুকে সন্দেহজনক স্থান যেমন নিচু জায়গা বা ড্রেনের পাশে ঘাস খাওয়ানো থেকে বিরত রাখতে হবে।
তড়কা রোগ
তড়কা গবাদিপশুর একটি মারাত্মক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রামক রোগ। গবাদিপশু থেকে এ রোগে মানুষেও ছাড়ায়। এ রোগের জীবাণু দ্বারা সংক্রামিত খাদ্য খেয়ে বিশেষ করে নদী-নালার পানি ও জলাবদ্ধ জায়গার ঘাস খেয়ে গবাদিপশু অ্যানথ্রাক্স রোগে আক্রান্ত হয়।
রোগের লক্ষণ
  • দেহের লোম খাড়া হয়। দেহের তাপমাত্রা ১০৬-১০৭ ডিগ্রি ফারেনহাইট পর্যন্ত হয়।
  • নাক, মুখ ও মলদ্বার দিয়ে রক্তক্ষরণ হতে পারে। পাতলা ও কালো পায়খানা হয়।
  • লক্ষণ প্রকাশের ১-৩ দিনের মধ্যে পশু ঢলে পড়ে মারা যায়।
চিকিৎসা ও প্রতিরোধ
পেনিসিলিন/বাইপেন ভেট/জেনাসিন ভেট/ এম্পিসিন ভেট ইনজেকশন দেয়া যেতে পারে। এ ছাড়াও স্ট্রেপটোমাইসিন/এন্টিহিস্টাভেট ইনজেকশন দেয়া যেতে পারে। সুস্থ পশুকে সর্বদা পৃথক রাখতে হবে। মৃতপশুর মল, রক্ত ও ম্রৃতদেহ মাটির নিচে পুঁতে ফেলতে হবে।
মো. আব্দুর রহমান*
* শিক্ষার্থী ও সাংবাদিক, বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, ময়মনসিংহ-২২০২,
বৃষ্টিতে বাউফলে ১৪ হাজার হেক্টর ফসলের ক্ষয়ক্ষতি

বৃষ্টিতে বাউফলে ১৪ হাজার হেক্টর ফসলের ক্ষয়ক্ষতি

পটুয়াখালীর বাউফল উপজেলায় গত তিন দিনের অবিরাম বৃষ্টির কারনে আমান ধান ও সবজির ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। ধানে শীষ আসার পূর্ব মূহুর্তে এ ধরনে দুর্যোগ ধান ফলনের ক্ষেত্রে ব্যাপক প্রভাব পড়বে বলে জানিয়েছেন উপজেলা কৃষি অফিস। এ দুর্যোগের ফলে দিশেহারা হয়ে পড়েছে উপজেলা প্রান্তিক কৃষকরা।

উপজেলা কৃষি অফিস সুত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উপজেলায় ৩৭ হাজার ৬শ হেক্টর জমিতে আমন চাষ করা হয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার হেক্টর জমিতে স্থানীয় জাতের ও ১৭ হাজার ৬শ হেক্টর জমিতে উচ্চফলনশীল আমান চাষ করা হয়। অপর দিকে ৩ হাজার ৫শ হেক্টর জমিতে বেগুন, টমেটো, লাউ, পালনশাক ও লালশাক ইত্যাদি ধরনের সবজি চাষ করা হয়েছে। আহাওয়া অনুকুলে থাকায় আমন ও সবজির বাম্পার ফলন হওয়ার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছিল। কিন্তু বিগত তিন দিনের বিরামহীন ভারি বর্ষনের ফলে ১২৫৬০ হেক্টর আমন ও ৩০০ হেক্টর সবজি ক্ষেতের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে।

সরজমিনে উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে দেখা গেছে টানা বৃষ্টির কারনে জমির ধান গাছের গোড়ালী ভেঙ্গে পড়েছে। কোন উপায় না পেয়ে কৃষরা ক্ষেতের কাছে গিয়ে শুধু নির্বাক দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। চর কালাইয়া এলাকার বর্গা চাষী বাদল প্যাদা জানিয়েছেন, তার প্রায় ৩ একর জমির অধিকাংশ ধান টানা বৃষ্টি ও ঝরো বাতাসের কারনে শুয়ে পড়েছে। তিনি বলেন, মহাজনের কাছ থেকে জমি বর্গা ও সুদের ওপড় টাকা নিয়ে ধান চাষে দুর্যোগের কারনে এ বছর ক্ষতির মুখে পড়তে হলো। এক সময়ে ধান চাষী সংকর হাওলাদার জানান, বিগত বছরে ধান চাষে লোকাসান গুনে এ বছর সবজি চাষ শুরু করে ছিলাম। কিন্তু সে আশায়ও সেগুরেবালী।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সরোয়ার জামান সময়ের কণ্ঠস্বরকে জানান, আমার মাঠ পর্যায়ের কৃষকদের এ ধরনের দুর্যোগের পূর্বাভাস দুই দিন আগেই দিয়ে ছিলাম। চাষীদের ক্ষেতের পানি নিস্কাসনের জন্য বলা হয়েছে। তবে যে জমির ধান গাছ শুয়ে পড়েছে তার ৩৫ভাগ ধান নষ্ট হলেও বাকীটা ভালো থাকবে বলে আশা করা যায়।

জৈব কৃষি নীতি অনুমোদন

কৃষি পরিবেশ রক্ষায় জৈব কৃষি নীতি অনুমোদন

মাটির গুণাগুন ও কৃষি পরিবেশ রক্ষায় জৈব কৃষি নীতি করছে সরকার।

এ লক্ষ্যে ‘জাতীয় জৈব কৃষি নীতি, ২০১৬’ এর খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

সচিবালয়ে সোমবার (৭ নভেম্বর) প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার নিয়মিত বৈঠকে এ অনুমোদন দেওয়া হয়। বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম প্রেস ব্রিফিংয়ে এ অনুমোদনের কথা জানান।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘আমাদের জাতীয় কৃষি নীতি, ২০১৩ রয়েছে। এটার আওতায় জৈব কৃষির জন্য এ নীতিটি প্রস্তাব করা হয়েছে।’

‘এটি কয়েকটি অনুচ্ছেদের ছোট একটি নীতি। এতে মোট ছয়টি অনুচ্ছেদ রয়েছে-ভূমিকা, উদ্দেশ্য, জৈব কৃষি নীতিমালা, প্রতিষ্ঠানিক নীতি, আইনগত কাঠামো ও উপসংহার।’

পৃথিবীর ১৭২টি দেশে জৈব চাষাবাদ হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘এরমধ্যে ৭৮টি দেশ নিজ নিজ জৈব নীতি প্রবর্তন করেছে। তাদের অনুসরণে সার্কভুক্ত দেশের মধ্যে ভারত ও ভুটান এটা করে ফেলেছে। বাংলাদেশ পাকিস্তান ও নেপালে প্রণয়নের কাজ চলছে। আমাদেরটা আজকে অনুমোদনের প্রেক্ষিতে এটা চূড়ান্ত হলো।’

শফিউল আলম বলেন, ‘এখানে ফোকাস করা হয়েছে রাসায়নিক সারের অসম ব্যবহারের ফলে ভূমির যে অবক্ষয় হয়, উর্বরতা হ্রাস পায় তাকে জৈব ও সুষম সার ব্যবহারের মাধ্যমে কীভাবে কমপেনসেট (কমানো) করা যায়। মাটির গুণাগুন ও কৃষির পরিবেশ এগুলো মধ্যে যাতে কোন নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে সে আঙ্গিকে কাজ করার জন্য কিছু গাইডলাইন দেওয়া হয়েছে নীতিতে।’

বিমসটেক দেশের মধ্যে বিদ্যুৎ ভাগাভাগিতে এমওইউ

শফিউল আলম বলেন, ‘বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে গ্রিড কানেকশনের জন্য একটি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) স্বাক্ষরের জন্য খসড়া অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।’

তিনি বলেন, ‘বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টিসেক্টরাল, টেকনিক্যান অ্যান্ড ইকনমিক কো-অপারেশন বা বিমসটেকভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে অনেক দিন ধরে এটা কার্যকরের জন্য আলাপ হচ্ছে। বিভিন্ন সেক্টরে কো-অপারেশন (সহযোগিতা), এখন বিদ্যুৎ সেক্টেরে আমরা কিভাবে সহযোগিতা করতে পারি? গ্রিড (বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা) ইন্টারকানেকশনের (এক দেশের সঙ্গে অন্য দেশের সংযোগ) জন্য এ এমওইউটা তৈরি করা হয়েছে। বলতে গেলে সদস্যভুক্ত সব দেশই এই এমওইউটার প্রতি সমর্থন জ্ঞাপন করেছে ‘

‘আমাদের মন্ত্রিসভাও এ এমওইউটা অনুমোদন করেছে, আমরাও একই চুক্তিতে অবদ্ধ হব।’

এ চুক্তি মিয়ানমার থেকে জলবিদ্যুৎ ও গ্যাস আমদানিতে ভূমিকা রাখবে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘বিমসটেকে গ্রিড কানেককশন যদি স্থাপিত হয় তবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে ঋতু বৈচিত্রের কারণে বিদ্যুৎ ব্যবহারে সুবিধা হবে। আমাদের দেশে যখন গরম তখন দেখা যাবে অন্য দেশে শীত। তখন তারা বিদ্যুৎ ট্রান্সফার করে আমাদের দিতে পারবে। এ জাতীয় বিষয়গুলো তখন গুরুত্ব পাবে।’

পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইনের সংশোধন অনুমোদন

বৈঠকে ‘পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক (সংশোধন) অধ্যাদেশ, ২০১৬’ এর খসড়া চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘পল্লী সঞ্চয় ব্যাংকের সঙ্গে একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পের সম্পর্ক রয়েছে। একটি বাড়ি একটি খামার থেকেই ব্যাংকটি ২০১৪ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয়।’

‘এই আইনে (পল্লী সঞ্চয় ব্যাংক আইন) একটি সমস্যা আছে যে ২০১৬ সালের ৩০ জুনের পর একটি বাড়ি একটি খামার প্রকল্পটি বিলুপ্ত হয়ে ব্যাংকের সঙ্গে মার্জ (একীভূত) হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু সে প্রস্তুতি সম্পন্ন না হওয়ায় সময়ের বাধা উঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।’

শফিউল আলম বলেন, ‘৩৯ ধারার উপধারা-১ এর (ক) এ পরিবর্তন আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। আগে যেখানে ৩০ জুন ছিল সেটা উঠে গিয়ে সরকার কর্তৃক নির্ধারিত সময়ে উক্ত প্রকল্পগুলো ব্যাংকে চলে আসবে।’

প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী ২০১৬ সালের ৩০ জুন থেকে এ সংশোধন কার্যকর হবে জানিয়ে মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘আরেকটি (সংশোধিত আইনে) প্রভিশন আনা হয়েছে, মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি আইন-২০০৬ এর আওতায় (ব্যাংক) থাকবে না। এটা সমবায় ব্যবস্থাপনায় নিজস্বভাবে চলবে।’

এখন সংসদ অধিবেশন না থাকায় এটা অধ্যাদেশ আকারে জারি করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলেও জানান মন্ত্রিপরিষদ সচিব।

বিদ্যালয়ে থাকবে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত

‘জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড আইন, ২০১৬’ এর খসড়া নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে মন্ত্রিসভা।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘এ আইনটি মূলত ইংরেজি আইনের বাংলা অনুবাদ। ১৯৮৩ সালের অধ্যাদেশ ছিল, যেহেতু এটা সামরিক শাসনামলের অধ্যাদেশ এজন্য এটিকে ইংরেজি থেকে বাংলায় অনুবাদ করে সামান্য পরিবর্তন সহকারে নতুন আইন হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে।’

বিদ্যালয়ের সংজ্ঞায় পরিবর্তন আনা হয়েছে জানিয়ে শফিউল আলম বলেন, ‘বিদ্যালয়ের অর্থে আগে মাদ্রাসা ব্যতিত শব্দটি ছিল। এখন তা উঠিয়ে দিয়ে বলা হয়েছে, এমন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান যা কোন আইনের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠিত বা স্বীকৃত হোক বা না হোক যেখানে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষা দেওয়া হয়।’

‘পাঠ্যপুস্তকের সংজ্ঞাটি আরও পরিস্কার করে বলা হয়েছে, পাঠ্যপুস্তক অর্থ প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত যে কোন শ্রেণির পাঠ্যপুস্তক।’

‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ অনুযায়ী প্রাথমিক অষ্টম শ্রেণি ও মাধ্যমিক শিক্ষার স্তর দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত। সে অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট আইনগুলো সংশোধন আনা হচ্ছে।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব বলেন, ‘সংশোধিত আইনে বোর্ডে সদস্য প্রস্তাব করা হয়েছে ৯ জন। এরমধ্যে ৮ জন সদস্য একজন চেয়ারম্যান হবেন। এরমধ্যে কমপক্ষে চারজন সদস্য উপস্থিত থাকলে কোরাম হবে। চেয়ারম্যান না থাকলে জ্যেষ্ঠ সদস্য সভায় সভাপতিত্ব করবেন। বোর্ডে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা থেকেও দু’জন সদস্য প্রতিনিধিত্ব করবেন।’

সূত্রঃ দি রিপোর্ট ২৪

সাগরে মৎস্য জরিপের কাজে নামছে আরভি মীনসন্ধানী

সাগরে মৎস্য জরিপের কাজে নামছে আরভি মীনসন্ধানী

সমুদ্রসীমায় মৎস্য সম্পদ অনুসন্ধান ও জরিপের সব আয়োজন সম্পন্ন করেছে সরকার। মালয়েশিয়া থেকে কেনা গবেষণা জাহাজ ‘আরভি মীনসন্ধানী’ দেশে এসেছে আগেই। নাবিকদের প্রশিক্ষণও শেষ পর্যায়ে। চলছে জাহাজের পরীক্ষামূলক চলাচল। এখন অপেক্ষা শুধু আনুষ্ঠানিক উদ্বোধনের। এর পরই শুরু হবে জরিপ। কার্যত এর মাধ্যমেই উন্মুক্ত হচ্ছে সাগরকেন্দ্রিক অর্থনীতির (ব্লু ইকোনমি) দুয়ার।
সরকারের নীতিনির্ধারণী একাধিক সূত্র জানায়, ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে মিয়ানমারের সঙ্গে এবং ২০১৪ সালের জুলাইয়ে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তির পর এই সাগরকেন্দ্রিক অর্থনীতির সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়। দেশের সমুদ্র অঞ্চলের আয়তন হয় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮১৩ বর্গকিলোমিটার। ২০০ নৌ-মাইল বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলসহ উপকূল থেকে ৬৬৪ নৌ-মাইল পর্যন্ত বিস্তৃত হয় দেশের সমুদ্র অঞ্চল। এই অঞ্চলের প্রাণিজ, খনিজ ও অপ্রাণিজ সব সম্পদের ওপর বাংলাদেশের সার্বভৌম অধিকার।
সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানায়, মৎস্য জরিপের পাশাপাশি, এ বছরের মধ্যে কিংবা আগামী বছরের গোড়ার দিকেই সমুদ্রবক্ষে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের কাজও শুরু হচ্ছে। সেই কাজে বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে যৌথভাবে অংশ নেবে রাষ্ট্রীয় তেল-গ্যাস অনুসন্ধান কোম্পানি বাপেক্সও, যা দেশের ইতিহাসে প্রথম। সমুদ্র সম্পদ আহরণ ও সমুদ্র অঞ্চলের অর্থনৈতিক ব্যবহার নিশ্চিত করার জন্য ভারত এবং চীনের সঙ্গে সমঝোতা স্মারকও সই করেছে সরকার।
এ ছাড়া সাগরকেন্দ্রিক অর্থনীতি চাঙা করার জন্য কী কী করা দরকার ও সম্ভব তা নির্ধারণ করার জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) সঙ্গে একটি চুক্তি করা হয়েছে। এই চুক্তির আওতায় দুই বছরের জন্য একটি গবেষণার কাজও শুরু হয়েছে বলে সরকারি সূত্রে জানা গেছে। তবে সাগরকেন্দ্রিক অর্থনীতির উন্নয়নের প্রথম মাধ্যম হবে জরিপ জাহাজের মাধ্যমে মৎস্য সম্পদের অনুসন্ধান, জরিপ ও আহরণ বাড়ানো।
বঙ্গোপসাগর থেকে প্রতিবছর আহরিত মোট মৎস্য সম্পদের নগণ্য অংশ বাংলাদেশ আহরণ করছে। বঙ্গোপসাগর থেকে গত বছর মাছ ধরা পড়েছে মোট ৮০ লাখ মেট্রিক টনেরও বেশি। এর মধ্যে বাংলাদেশ আহরণ করেছে ১ লাখ টনেরও কম। এই অবস্থা পরিবর্তনের জন্য অনুসন্ধান ও জরিপের তথ্য সম্বল করে মাছ আহরণের পদক্ষেপ নেওয়া সরকারের লক্ষ্য।
সেই লক্ষ্যে ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক (আইডিবি) ও মালয়েশীয় সরকারের আর্থিক সহায়তায় ১২০ কোটি টাকার প্রকল্প নেয় সরকার। প্রকল্পের আওতায় মালয়েশিয়া থেকে ৬৫ কোটি টাকায় কেনা হয়েছে ‘আরভি (রিসার্চ ভেসেল) মীনসন্ধানী’ নামের জাহাজটি। বাকি টাকা অনুসন্ধান ও জরিপের বিভিন্ন পর্যায়ের ব্যয় সংকুলানের জন্য রাখা হয়েছে।
গত ৬ জুন জাহাজটি দেশে আনা হয়েছে। এরপর নৌবাহিনী থেকে প্রেষণে আসা ক্রুদের প্রশিক্ষণ, জাহাজটির পরীক্ষামূলক চলাচল (ট্রায়াল ক্রুজিং) ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক প্রস্তুতিমূলক কাজ করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাহাজটির আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করবেন। তারপরই শুরু হবে অনুসন্ধান ও জরিপের কাজ।

সূত্রঃ প্রথম আলো।

sylhet_agricultural_university_05

দশ বছরে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়

টিলা ঘেরা সবুজ পরিবেশের উপর মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় (সিকৃবি )। মাত্র ৫০ একর জায়গা নিয়ে সিলেট সরকারি ভেটেরিনারি কলেজ থেকে ২০০৬ সালের ২ নভেম্বর দেশের চতুর্থ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে যাত্রা শুরু করে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়। আসছে বুধবার নয় পেরিয়ে দশ বছরে পদার্পণ করছে বিশ্ববিদ্যালয়টি। উত্তর পূর্বাঞ্চলের সামগ্রিক কৃষি ব্যবস্থাকে উন্নত করতে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একটি সম্ভাবনার নাম। সিলেটের লালচে মাটির গুণগতমান দেশের অন্যান্য অঞ্চল থেকে ভিন্নতর। আবার বৃহত্তর সিলেটে রয়েছে হাজার হাজার একর অনাবাদি উঁচু-নিচু পাহাড়ী  অসমতল ভূমি। আছে হাওর নামের বিস্তীর্ণ জলাশয়। অপার সম্ভাবনাময় এসব প্রাকৃতিক সম্পদসমূহকে গবেষণার মাধ্যমে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার আওতায় আনার জন্য ইতোমধ্যে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৬টি অনুষদ সাফল্যের সাথে কাজ করে যাচ্ছে। প্রতিষ্ঠার পর থেকেই এর একাডেমিক কার্যক্রম দুর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে।

এই বিশ্ববিদ্যালয়ে এগ্রোনমি এন্ড হাওর এগ্রিকালচার  এবং কোস্টাল অ্যান্ড মেরিন সায়েন্স নামে বিশেষ দুটি বিভাগ রয়েছে যা অন্য কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে নেই। একমাত্র সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়েই বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং নামে পূর্ণাঙ্গ অনুষদ রয়েছে।এখন পর্যন্ত  সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদ এবং মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদ থেকে গ্র্যাজুয়েট হিসেবে ৫টি করে ১০টি ব্যাচ বের হয়েছে। এদিকে ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স অনুষদ থেকে ইতোমধ্যে ১৭টি ব্যাচ বেরিয়ে গেছে। সম্প্রতি কৃষি অর্থনীতি ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ থেকে বেরোলো আরো তিনটি ব্যাচ। এরা সবাই এখন স্ব স্ব ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের মুখ উজ্জ্বল করে আছে এবং বাংলাদেশের কৃষির উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। সদ্য ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স অনুষদের ইন্টার্নি ডাক্তার আকাশ খাসনবিস বলেন-“ভাবতে ভালই লাগছে এখন থেকে আমি একজন ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্স গ্র্যাজুয়েট হতে যাচ্ছি। আমার একাডেমিক জ্ঞানটুকু এবার মাঠে কাজে লাগাবো।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর মধুর সম্পর্কের কারণেই আমরা সফল হয়েছি। আরো খুশি হচ্ছি যে, এখন থেকে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্স গ্র্যাজুয়েটদেরকে যুক্তরাষ্ট্রের আমেরিকান ভেটেরিনারি মেডিক্যাল এসোসিয়েশন তাদের দেশে প্রাকটিস করার জন্য স্টেট সার্টিফিকেট পরীক্ষা দেয়ার সুযোগ দিবে বলে জানিয়েছে।” ছোটবড় টিলা পরিবেষ্টিত ৫০ একর আয়তনের মনোরম সিকৃবি ক্যাম্পাস। সবুজে ঘেরা, ছোট ছোট টিলা ক্যাম্পাসের পরিবেশকে আরো মোহনীয় করে তুলেছে। “আয়তনে ছোট হলেও এর রূপ-সৌন্দর্য্য আমাদের হৃদয়ে আলাদা একটা টান ও ভালবাসা জন্মায়।”- ক্যাম্পাস সম্পর্কে নিজের অনুভূতি এভাবেই ব্যক্ত করেন কৃষি অনুষদের ছাত্রী নাহিদা আক্তার। তিনি আরো বলেন, “এখানকার বিভিন্ন সংগঠনে যোগ দিয়ে নিজের আত্মবিশ্বাস আরো বেড়ে গেছে। বিশেষ করে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো মননশীল চিন্তা করতে সাহায্য করছে।” বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়বে আর আড্ডা হবে না সেটা কি হয়! কেউ কেউ আবার ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে দেয় আড্ডা। এর মধ্যে ফুচকা চত্বর, জালাল মামার চায়ের দোকান, ট্যাংকির তলা, কাঁঠাল তলা, ক্যাফেটেরিয়া, ইকোপার্ক ইত্যাদি বেশ জনপ্রিয়। গবেষণা: বিশ্ববিদ্যালয় হওয়ার পর থেকেই সিকৃবি ক্যাম্পাসে গবেষণা হচ্ছে। বর্তমানে সবচেয়ে আলোচিত গবেষণা  হল- গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ। টমেটো বা শিম এখন আর শুধুমাত্র শীতকালে চাষ হবে না।

সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যানতত্ত¡ বিভাগের চেয়ারম্যান ড. মোঃ শহীদুল ইসলাম একজন প্রথিতযশা কৃষি বিজ্ঞানী। সম্প্রতি তার তত্ত্ববধানে শিমের নতুন দুটি জাত অনুমোদন পেয়েছে। প্রোটিন সমৃদ্ধ এই জাতগুলোর তিনি নাম দিয়েছেন  সিকৃবি শিম-১ ও সিকৃবি শিম-২। শিক্ষক হিসেবে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পূর্বে তিনি ১৯৯২ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটে কৃষি বিজ্ঞানী হিসেবে গবেষণা করেছেন। বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ২০০৬ সালে পিএইচডি সম্পন্ন করার সময় তিনি লক্ষ্য করেন যে, শিম টমেটোসহ কয়েকটি জনপ্রিয় সবজি শুধুমাত্র শীতকালে উৎপাদিত হয়। তখনি তিনি ভাবলেন এই সবজিগুলো যদি গ্রীষ্মকালসহ সারাবছর পাওয়া যেত তাহলে খুব ভালো হতো। সেই থেকেই তিনি  গ্রীষ্মকালীন শিম ও টমেটো নিয়ে গবেষণার কাজ শুরু করেন। তার সহায়তায় ইপসা শিম-১ সহ আরো কয়েকটি জাত উদ্ভাবিত হয়। ২০১১ সালে তাঁর তত্ত্বাবধানে বারি শিম-৭ নামে একটি গ্রীষ্মকালীন শিমের জাত তিনি উদ্ভাবন করেন। সিলেট এসে তিনি লক্ষ্য করেন এই অঞ্চলে শিম-টমেটোর বেশ কদর রয়েছে।

তিনি সিলেটের গ্রামে গ্রামে গিয়ে গ্রীষ্মকালীন শিম লাগানোর জন্য কৃষকদের উৎসাহিত করেন। সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণা মাঠসহ বিভিন্ন অঞ্চলে তিনি গ্রীষ্মকালীন শিম-টমেটোর পরীক্ষামূলক চাষাবাদ শুরু করেন। তাঁর অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হিসেবে সারা বাংলাদেশে সিকৃবি শিম-১ ও সিকৃবি শিম-২ জাত দুটি আলোর মুখ দেখলো। এই জাত সিলেট অঞ্চলে বছরব্যাপী ধরে প্রোটিনের চাহিদা মেটাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। মৃত্তিকা বিজ্ঞান বিভাগের আরেক বিজ্ঞানী প্রফেসর ড. মোঃ আবুল কাশেম। হাওর এলাকার ধানের ফলন বৃদ্ধির জন্য তিনি গবেষণা করছেন। তাছাড়া হাওর এলাকায় সমন্বিত খামার ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে মাঠ ফসল, মাছ, গবাদিপশু-পাখির উৎপাদন বৃদ্ধির লক্ষ্যে তিনি কাজ করে যাচ্ছেন। কৃষিতত্ত্ব ও হাওর কৃষি বিভাগের অধ্যাপক ড. মৃত্যুঞ্জয় বিশ্বাস গবেষণা করছেন সরিষা ফসল নিয়ে। বিস্তৃর্ণ হাওর এলাকায় কিভাবে উন্নত জাতের সরিষার চাষ করে প্রচলিত ফসল ধারার উন্নয়ন করা যায় সে উদ্দেশ্যে তিনি গবেষণা কার্যক্রম চালাচ্ছেন। একই বিভাগের চেয়ারম্যান প্রফেসর ড. মোঃ নজরুল ইসলাম গবেষণা করছেন আগাছা নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে ধানের ফলন বৃদ্ধি নিয়ে। এই গবেষণা সফল হলে বাংলাদেশে ধানের উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে বলে আশা করা যাচ্ছে। সিলেট অঞ্চলে শীতকালীন ফসল চাষের জন্য পানির স্বল্পতা রয়েছে। কোথাও কোথাও অবশ্য স্বল্প পরিসওে বোরো ধানের চাষ করা হচ্ছে।

কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদের সেচ বিজ্ঞানী ড. সানজিদা পারভীন রিতু তাই ভিন্নধর্মী একটি গবেষণা চালাচ্ছেন। সিলেটের উঁচু জমিতে এমনিতেই সেচ প্রয়োগের সুযোগ তেমন নেই। সেচ সুবিধার অভাবে হেক্টরের পর হেক্টর জমি অনাবাদি থেকে যাচ্ছে। ড. সানজিদা ভূট্টা ফসলে সেচ বিষয়ে তাঁর গবেষণা শুরু করেছেন। এই গবেষণায় সফল হলে সিলেট অঞ্চলের “ক্রপ রোটেশন” পরিবর্তন হতে পারে। কম পানি দিয়েও বছরে ৩টি ফসল চাষ করা যাবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।

বায়োটেকনোলজি ও জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মেহেদী হাসান খান অল্প খরচে মাছ দিয়ে কিভাবে স্বাস্থ্যসম্মত খাবার তৈরি করা যায় তা নিয়ে গবেষণা করছেন। এর পাশাপাশি সিলেটের জলাবদ্ধ এলাকায় ভাসমান বেড তৈরি করে প্রাণীর খাদ্য উৎপাদন বাড়াতে তিনি গবেষণা করে যাচ্ছেন। বিপন্ন মাছ সংরক্ষণ নিয়ে গবেষণা করেন মৎস্যবীদ ফিসারিজ বায়োলজি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ মাহবুব ইকবাল। বর্তমানে তিনি হাওর ও নদী অঞ্চলের বিলুপ্ত প্রজাতির আইড় মাছের প্রজনন নিয়ে গবেষণা করছেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিলের অর্থায়নে সিলেটের জকিগঞ্জের আমেরিকান ফিস ফার্ম লিমিটেডের সাথে যৌথভাবে তিনি এই গবেষণা কাজ সম্পন্ন করছেন। মাৎস্য-বিজ্ঞান অনুষদের পাশেই ছোট ছোট রিসার্চ পুকুর বানানো হয়েছে। এছাড়াও সারা ক্যাম্পাসের পুকুরগুলোকে গবেষণার আওতায় আনা হয়েছে। আইড় মাছ ছাড়াও ক্যাম্পাসে ফ্রেশ ওয়াটারে চিংড়ি চাষ এবং তাপ দিয়ে মনোসেক্স তেলাপিয়ার লিঙ্গপরিবর্তন নিয়েও কাজ হয়েছে। মাৎস্য-বিজ্ঞান অনুষদের শিক্ষার্থী গোলাম রাব্বানী বলেন- “মাছ নিয়ে পড়াশুনা আমার কাছে এখন খুব অবাক লাগছে। এখানে ভর্তি না হলে জানতামই না কাটাওয়ালা এই প্রাণীটির ভেতর এতো রহস্য লুকিয়ে আছে।”

গবেষণা মাঠ অধিগ্রহণ সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বহিঃক্যাম্পাস হিসেবে প্রায় ১০ কিলোমিটার দূরে ফেঞ্চুগঞ্জ-তামাবিল বাইপাস সড়ক সংলগ্ন খাদিম নগর এলাকায় ১২.৩ একর জায়গা অধিগ্রহণ করা হয়েছে। গত প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে সিলেট জেলা প্রশাসন বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে জায়গাটি বুঝিয়ে দেন। মাত্র ৫০ একর জমি নিয়ে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস যাত্রা করেছিল যার বেশির ভাগ টিলা ও জঙ্গলবেষ্টিত। উক্ত গবেষণা মাঠ প্রাপ্তির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা কাজের সুযোগ বৃদ্ধি পাবে এবং নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখবে। এত প্রাপ্তির মাঝেও কিছু না পাওয়ার কথা রয়ে গেছে যেমন, ব্যবহারিক ক্লাসের জন্য অধিগ্রহণকৃত  জায়গাটিতে এখনো পুরোদমে কাজ  শুরু করতে পারেননি গবেষকবৃন্দ। ফলে শিক্ষার্থীরা হাতে কলমে শিক্ষালাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। সিলেট শহরে যাতায়াতের জন্য বাস নিয়েও ভোগান্তির শেষ নেই। প্রায় চারহাজার শিক্ষার্থীর জন্য মাত্র ৩টি বাস। বাঁদুড় ঝোলা হয়ে যাতায়াত করতে হয়। ফলে যারা সিলেট শহর থেকে ক্যাম্পাসে আসেন তারা পড়েন চরম বিপাকে। ডাইনিং এর খাবার নিয়েও রয়েছে অনেক অভিযোগ। নেই ভালো খেলার মাঠ, অডিটরিয়ামটাও ছোট। সবকিছু ছাপিয়ে শিক্ষার্থীদের প্রধান দাবী হয়ে উঠেছে- গবেষণার জন্য মাঠ। তবে এতো সংকটের ভেতর নতুন করে সম্ভাবনা জাগিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে উন্নয়ন কর্মকান্ড। পুরো ক্যাম্পাসকে ঢেলে সাজানো হচ্ছে নতুন নতুন অবকাঠামোয়।

উল্লেখযোগ্য উন্নয়ন কর্মকান্ড হচ্ছে ভূমি ব্যবস্থাপনা ও খেলার মাঠ উন্নয়ন, নতুন ছাত্র ও ছাত্রী হল, উপাচার্য বাসভবন, অধ্যাপক-কর্মকর্তা কোয়ার্টার, শিক্ষক-কর্মকর্তা ডরমেটরি, কর্মচারী ডরমেটরি, অতিথি ভবন, নতুন আরেকটি ভেটেরিনারি অ্যান্ড এনিম্যাল সায়েন্স ভবন, কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার, ভেটেরিনারি ক্লিনিক, অস্থায়ী খামার বাড়ি, অস্থায়ী মৎস্য প্রজনন কেন্দ্র এবং নতুন রাস্তা নির্মাণ। এছাড়া অসম্পূর্ণ ছাত্রহল এবং ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রটিও নির্মাণাধীন বয়েছে। দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলেছে কৃষি প্রকৌশল ও কারিগরি অনুষদ ভবনের কাজ। শেষ হওয়ার পথে কেন্দ্রীয় শহিদমিনার ও কৃষি অর্থনীতি ও ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদ ভবন।

বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান নির্বাহী অর্থাৎ ভাইস-চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মো: গোলাম শাহি আলম দেখালেন আশার স্বপ্ন-“মাত্র কয়েক বছরে ছয়টি অনুষদকে সাথে নিয়ে সিকৃবি ঈর্ষণীয় সাফল্যের পথে হাঁটছে। সিকৃবির হাত ধরেই সিলেট তথা সমগ্র বাংলাদেশে কৃষিতে বিপ্লব আসবে যার কর্ণধার হবে এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তৈরি হওয়া যোগ্য কৃষিবিদ।” স্কুলে ভর্তি হবার পর বাবা-মা তাদের সন্তানদের মাথায় শুধু ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার ভূত চাপিয়ে দেন। কিন্তু  কৃষিও একটি মহান পেশা। শুধুমাত্র কৃষিবিদদের গবেষণা ও পরিশ্রমের ফলে কৃষক আজ টনকে টন ধান, পুকুর ভরা মাছ ঘরে তুলছে, মাংস ও ডিমের মাধ্যমে আমিষের চাহিদা মেটাচ্ছে। যার সুফল হিসেবে বর্তমান সরকারের আমলে ২০১৪-২০১৫ অর্থবছরে ডিম উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে গেছে। দেশের চাহিদা মিটিয়েও বছরে ২-৩ লাখ টন চাল রপ্তানির সক্ষমতা অর্জিত হয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনের দিক থেকে পোশাক এবং জনশক্তির পর এখন মাছ ও শাক-সবজির অবস্থান। উত্তর পূর্বাঞ্চলের তথা দেশের সামগ্রিক কৃষির এই উন্নয়নের অগ্রযাত্রা অব্যাহত রাখতে সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় একটি আশার প্রতিশ্রুতি। ছায়া-সুনিবিড়, সবুজ টিলায় ঘেরা ছোট্ট সুন্দর ক্যাম্পাসের এক দশক পূর্তিতে তাই ক্যাম্পাসের সকলের মনে রঙ লেগেছে।

লেখক: কর্মকর্তা, জনসংযোগ ও প্রকাশনা দফতর, সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়।

ড্রাগন ফল চাষ

ড্রাগন ফল চাষ

ড্রাগন ফ্রুটঃ ড্রাগন ফলের উৎপত্তিস্থল সেট্রাল আমেরিকা। সেন্ট্রল আমেরিকাতে এ ফলটি প্রবর্তন করা হয় এয়োদশ সেঞ্চুরীতে। দক্ষিণ এশিয়া বিশেষ করে মালেশিয়াতে এ ফলের প্রবর্তন করা হয় বিংশ শতাব্দীর শেষে। তবে ভিয়েতনামে এ ফল ব্যাপকভাবে বাণিজ্যিকভাবে চাষ করা হয়। তবে বর্তমানে এ ফলটি মেক্সিকো, সেন্ট্রাল ও দক্ষিণ আমেরিকা, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া, দক্ষিণ চীন, ইসরাইল, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়াসহ বাংলাদেশেও চাষ করা হচ্ছে। বাংলাদেশে এ ফল প্রথম প্রর্বতন করে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের বাউ জার্মপ্লাজম সেন্টার, ২০০৭ সালে। এ সেন্টারের পরিচালক প্র. ড. এম. এ. রহিম এ  ফলের জাত নিয়ে আসেন থাইল্যান্ড থেকে। এখন এ সেন্টার থেকে এ ফলটি বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে ছড়িয়ে দেওয়ার জন্য বংশ বিস্তার করা হচ্ছে। ড্রাগন ফল ক্যাকটাস পরিবারের একটি ফল। গাছ দেখে সবাই  একে চির সবুজ  ক্যাক্টাস বলেই মনে করেন। এশিয়ার মানুষের কাছে এ ফল অনেক জনপ্রিয়, হালকা মিষ্টি-মিষ্টি। এ ফলকে ড্রাগন ফল ছাড়াও পিটাইয়া, টিহায়া ইত্যাদিও নামে ডাকা হয়। এ গাছে শুধুমাত্র রাতে ফুল দেয়। ফুল লম্বাটে সাদা ও হলুদ। যাকে ‘মুন ফ্লাওয়ার’ অথবা ‘রাতের রাণি’ বলে অভিহিত করা হয়। ইহা একটি লতানো গাছ কিন্তু এর কোন পাতা নেই। ইহা একটি স্বপরাগায়িত ফুল। তবে মাছি, মৌমাছি ও পোকা-মাকড় এর পরাগায়ন ত্বরান্বিত করে এবং কৃত্রিম পরাগায়ন করা যেতে পারে।  এ গাছ উজ্জ্বল আলো পছন্দ করে। এ গাছ ১.৫-২.৫ মিটার লম্বা হয়। তবে এ গাছকে উপরের দিকে ধরে রাখার জন্য সিমেন্টের/বাঁশের সাথে উপরের দিকে তুলে দেওয়া যেতে পারে। এছাড়া উপরের দিকে ছোট মোটর গাড়ীর (মাইক্রোবাস, প্রাইভেটকার) চাকা বাঁশের চ্যাগারের মাধ্যে সেট করে খুব সহজেই এ গাছের লতা গুলোকে বাড়তে দেওয়া যায়।
পুষ্টি ও ব্যবহারঃ সব ডায়েটের জন্য এ ফলটি উপযুক্ত। এটি ফাইবার সরবরাহ করে যা ল্যাক্সটিভ এবং লিভার এর জন্য উত্তম। খাবারের পর ডের্জাট হিসাবে খাওয়া হয়। এ ফলটি প্রচুর পরিমানে ভিটামিন সি, মিনারেল এবং উচ্চ ফাইবার যুক্ত। এ ফলটি জুস তৈরিতে প্রচুর পরিমানে ব্যবহৃত হয়। প্রতি ১০০ গ্রাম ফলে ফাইবার ০.৯ গাম, ফ্যাট ০.৬১ গ্রাম, এ্যাশ ০.৬৮ গ্রাম, ক্যারোটিন ০.০১২ গ্রাম, পানি ৮৩.০ গ্রাম, ফসফরাস ৩৬.১ মি. গ্রাম, এসকোরবিক এসিড ৯.০ মি. গ্রাম, প্রোটিন ০.২২৯ গ্রাম, রিবোফ্লাবিন ০.০৪৫ মি. গ্রাম, ক্যালসিয়াম ৮.৮ গ্রাম, নায়াসিন ০.৪৩০ মি. গ্রাম, আয়রন ০.৬৫ মি. গ্রাম থাকে। এ ছাড়া এ ফল উৎপাদিত দেশ গুলোতে ফলের ডিশের সাথে এ ফল না থাকলে যেন ডিশ অপূর্ণ থাকে যা দেখতে অত্যান্ত   আকর্ষণীয় ও মনোমুগ্ধকর। একটি তাজা ফল খেয়ে মানব শরীরকে সতেজ ও সুস্থ রাখা যায় অনেক খানিই। যে সমস্ত মানুষ ডায়াবেটিক রোগে ভোগেন তারা এ ফল খেয়ে শরীরের রক্তের গ্লুকোজকে সহজেই নিয়ন্ত্রণ করতে পারেন। ফ্রেশ ফলের চেয়ে শুষ্ক ফল বেশী কার্যকরী। এ ফল সালাদের সাথেও ব্যবহার করা যায়।
জলবায়ু ও মাটিঃ এ ফলটির জন্য শুষ্ক ট্রপিক্যাল জলবায়ু প্রয়োজন। মধ্যম বৃষ্টিপাত এ ফলের জন্য ভালো। উপযুক্ত বৃষ্টিপাত ৬০০-১৩০০ মি.মি. ও তাপমাত্রা ৩৮-৪০° সে। অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতে ফুল ঝরে পরে এবং ফলের পচন দেখা দেয়। ফলে যেখানে পানি জমে না এমন উঁচু জমিতে এ ফলটি সঠিকভাবে চাষ করা যায়। তবে ক্যাক্টাসের মতো  এ ফলটি শুষ্কুতা সহ্য করতে পারে না। উচ্চ জৈব পদার্থ সমৃদ্ধ বেলে-দোঁয়াশ মাটিতে এ ফল চাষের জন্য উত্তম। তবে অবশ্যই পানি সেচ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকতে হবে।
জাতঃ বাণিজ্যিক ভিত্তিতে সফলভাবে চাষ করার জন্য
  • লাল ড্রাগন ফল (লাল ফ্লেশ ও লাল চামড়া যুক্ত)
  • হলুদ ড্রাগন ফল (হলুদ চামড়া ও সাদা ফ্লেশশযুক্ত)
  • লাল ড্রাগন ফল (লাল চামড়া ও সাদা ফ্লেশশযুক্ত)
  • কালচে লাল ড্রাগন ফল (কালো ফ্লেশশযুক্ত ও কালচে চামড়া যুক্ত)।
ফলঃ গোলাকার থেকে ডিম্বাকার উজ্জ্বল গোলাপী থেকে লাল রংয়ের ফল। যার ওজন ২০০-৭০০ গ্রাম। এ ফল গুলো ৭-১০- সে.মি. চওড়া এবং ৮-১৪ সে.মি. লম্বা হয়। ভিতরের পাল্প সাদা, লাল, হলুদ ও কালো রংয়ের হয়। পাল্পের মধ্যে ছোট ছোট কালো নরম অনেক বীজ থাকে। এই বীজগুলো দাঁতের নীচে পড়লে সহজেই গলে যায়। এ ফলগুলো হালকা মিষ্টি-মিষ্টি। এর মিষ্টতা (টি.এস.এস./ব্রিক্স ১৬-২৪%) । ফলগুলো দেখতে ড্রাগনের চোখের মত রং ও আকার ধারন করে। ফলটির সামনের শেষের দিকে হালকা গর্তের মতো থাকে। এ ফলের চামাড়ার উপরে আনারসের মতো স্কেল থাকে।
দুরত্ব ও রোপনঃ গাছ থেকে গাছের দূরত্ব ৩ মি এবং সারি থেকে সারির দূরত্ব ৩ মি. দিয়ে হেক্সাগোনাল পদ্ধতি ব্যবহার করে  এ গাছ লাগানো উত্তম। তবে অবস্থাভেদে দূরত্ব কম বা বেশি দেওয়া যেতে পারে। গাছ লাগানোর সময ৫০-৭০ ঘন সে.মি. আকারের গর্ত করে, পুরোগর্তের ২/৩ ভাগ পঁচা গোবর দিয়ে ভালোভাবে মিশায়ে এ গাছ লাগানো ভাল। তবে গোবরের পরিমাণ ও গর্তের আকার কম বা বেশী হতে পারে । ক্যাকটেসি পরিবারের গাছ বিধায় বছরের যে কোন সময়ই লাগানো যায় তবে এপ্রিল-সেপ্টেম্বর মাসের মধ্যে লাগানো ভালো।
বংশ বিস্তারঃ এ ফলের বংশ বিস্তার অত্যান্ত সহজ। বীজ দিয়েও বংশ বিস্তার করা যেতে পারে। তবে এতে ফল ধরতে একটু বেশি সময় লাগে। সেজন্য কাটিং এর মাধ্যমে বংশ বিস্তার করাই উত্তম। কাটিং এর সফলতার হার প্রায় শতভাগ এবং ফলও তাড়াতাড়ি ধরে। কাটিংকৃত একটি গাছ থেকে ফল ধরতে ১৮-২৪ মাস সময় লাগে।
রোগ বালাই ও পোকা-মাকড়ঃ এ ফলে রোগ বালাই খুবই একটা চোখে পড়ে না। তবে মূল পচা, কান্ড ও গোড়া পচা রোগ দেখা যায়।
মূল পচাঃ অতিরিক্ত পানি জমে গেলে মূল পচে যায়। তবে এ থেকে পরিত্রান পেতে হলে উঁচু জমিতে এ ফলের চাষ করা ভাল। এ রোগটি ছত্রাকের আক্রমণে হয়ে থাকে।
কান্ড ও গোড়া পঁচা রোগঃ ছত্রাক অথবা ব্যাকটিরিয়া দ্বারা এ রোগ হতে পারে। এ রোগ হলে গাছের কান্ডে প্রথমে হলুদ রং এবং পরে কালো রং ধারণ করে এবং পরবতীতে ঐ অংশে পচন শুরু হয় এবং পঁচার পরিমান বাড়তে থাকে। এ রোগ দমনের জন্য যে কোন ছত্রাক নাশক (বেভিস্টিন, রিদোমিল, থিওভিট) ইত্যাদি প্রয়োগ করে সহজেই দমন করা যায়।
পোকা-মাকড়ঃ পোকা-মাকড় খুব একটা চোখে পড়ে না, তবে মাঝে মাঝে এফিড ও মিলি বাগের আক্রমণ দেখা যায়। বাচ্চা ও পূর্ণ বয়স্ক পোকা গাছের কচি শাখা ও পাতার রস চুষে খায়, ফলে আক্রান্ত গাছের কচি শাখা ও ডগার রং ফ্যাকাশে হয়ে যায় ও গাছ দূর্বল হয়ে পড়ে।
এ পোকা ডগার উপর আঠালো রসের মতো মল ত্যাগ করে ফলে শুটিমোল্ড নামক কালো ছত্রাক রোগের সৃষ্টি হয়।  এতে গাছের খাদ্য তৈরিতে ব্যহত হয়। ফলে ফুল ও ফল ধারন কমে যায়। এ পোকা দমনের জন্য যে কোন কীটনাশক যেমন সুমিথিয়ন/ডেসিস/ম্যালাথিয়ন ইত্যাদি প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২৫ মি.লি./৫ক্যাপ ভালভাবে মিশিয়ে স্প্রে করে সহজেই এ রোগ দমন করা যায়।
ফলনঃ দেড় থেকে দুই বছর বয়সের একটি গাছে ৫-২০টি ফল পাওয়া যায় কিন্তু পূর্ণ বয়স্ক একটি গাছে ২৫-১০০টি পর্যন্ত ফল পাওয়া যায় । হেক্টর প্রতি  ফলন ২০-২৫ টন।
ড্রাগন ফলের চারার জন্য যোগাযোগ করুন – ০১৭৭১৬২৫২৫২, ০১৯৭১৬২৫২৫২
শিম চাষ

দেশি শিম চাষ

শীমের ইংরেজী নাম Bean।শীতকালে দেশী শিম খুবই জনপ্রিয় সবজি। শীত মৌসুমের শুরুতেই সরবরাহ কম থাকায় দাম থাকে চড়া। আমিষসমৃদ্ধ এই শিম তরকারি হিসেবে দু’ভাবে খাওয়া হয়। দেশী শিম বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ শীতকালীন সবজি। এটি পুষ্টিকর, সুস্বাদু এবং সব শ্রেণীর লোকের কাছে অত্যন্ত জনপ্রিয়। শিমের কচি শুঁটির বীজে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন ও শ্বেতসার থাকে বলে খাদ্য হিসেবে খুবই উপকারী। তা ছাড়া এতে যথেষ্ট পরিমাণে ক্যালসিয়াম, ফসফরাস এবং ভিটামিন ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ থাকে। আমাদের দেহের পুষ্টিসাধনে এসব পুষ্টি উপাদানের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে।
শিম সব ধরনের মাটিতেই চাষ করা যায়। তবে দো-আঁশ বা বেলে দো-আঁশ মাটি দেশী শিম চাষের জন্য বেশি উপযোগী। পানি জমে না এমন উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি শিম চাষের জন্য বেছে নেয়া ভালো।
বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিটিউট উদ্ভাবিত দেশী শিমের জাত বারি শিম-১ ও বারি শিম-২ চাষের জন্য বেশ ভালো। এ ছাড়া বারমাসী সাদা ইপসা-১ ও বারমাসী বেগুনি ইপসা-২ জাত দুটিও প্রায় সারা বছর চাষ করা যায়।

উপয়োগী জমি ও মাটি : প্রায় সব ধরনের মাটিতে শিম চাষ করা যায়। তবে দো-আঁশ ও বেলে দোআঁশ মাটিতে এর ফলন সবেচেয়ে ভালো হয়।

জাত নির্বাচন : শিমের বিভিন্ন জাতের মধ্যে ঘৃতকাঞ্চন, নলডক, আশ্বিনা, কার্তিকা, হাতিকান, বৌকানী, রূপবান, বারি শিম-১, বারি শিম-২, বারি শিম-৩, বারি শিম-৪, ইপসা-১ ও ইপসা-২ প্রভৃতি উল্লেখযোগ্য।

বীজ বপনের সময় : আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস বীজ বপনের উপযুক্ত সময়।

মাদা তৈরি ও সার প্রয়োগ : দেশী শিম প্রধাণত মাদা প্রথায় বসতবাড়ির আশপাশে, পুকুরপাড়ে, পথের ধারে ও জমির আইলে চাষ করা হয়। তবে সারি করে চাষ করা হলে ১ মিটার দূরত্বে সারি করে প্রতি সারিতে ৫০ সেমি পর পর ৪৫ সেমি লম্বা, ৪৫ সেমি চওড়া ও ৪৫ সেমি গভীর করে মাদা তৈরি করতে হয়। তারপর প্রতি মাদার মাটির সাথে ১০ কেজি পচা গোবর, ১৫০ গ্রাম টিএসপি ও ১০০ গ্রাম এমওপি সার ভালোভাবে মিশিয়ে মাদা ভরাট করতে হবে। বীজ বপনকালে বর্ষা থাকে, তাই মাদায় যাতে পানি না জমে সে জন্য জমির সাধারণ সমতল হতে মাদার ভরাট মাটি ৫ সেমি পরিমাণ উঁচু রাখতে হয়।

বীজ বপন : মাদায় সার প্রয়োগের ৮-১০ দিন পর প্রতি মাদায় দুই-তিনটি বীজ ফাঁক ফাঁক করে ২.৫-৩.০ সেমি গভীরে বপন করতে হয়। চারা গজানোর ১০-১২ দিন পর প্রতি মাদায় দু’টি সুস্থ ও সবল চারা রেখে বাকিগুলো উঠিয়ে ফেলতে হবে। বীজ বপনের আগে ২৪ ঘণ্টা পানিতে ভিজিয়ে নিলে তাড়াতাড়ি চারা গজায়। এক শতক বা ৪০ বর্গমিটার জমিতে ৪০ গ্রাম (হেক্টরে ৫-৭ কেজি) শিম বীজের প্রয়োজন হয়।

পরবর্তী পরিচর্যা : সিমের চারা ও তার আশপাশের আগাছা নিড়ানি দিয়ে নিয়মিত পরিষ্কার করতে হবে। তা ছাড়া মাঝে মধ্যে নিড়ানি দিয়ে চারার গোড়ার মাটি খুঁচিয়ে আলগা ও ঝুরঝুরে করে রাখতে হবে। শিমের খরা সহ্য করার মতা থাকলেও বৃষ্টির অভাবে মাটিতে রসের ঘাটতি হলে পানি সেচ দিতে হবে।

উপরি সার প্রয়োগ : শিমের জমিতে সার উপরি প্রয়োগের কাজ দুই কিস্তিতে করতে হয়। প্রথম কিস্তি চারা গজানোর এক মাস পর এবং দ্বিতীয় কিস্তি গাছে দুই-চারটি ফুল ধরার সময়। প্রতি কিস্তিতে মাদা প্রতি ২৫ গ্রাম ইউরিয়া ও ২৫ গ্রাম এমওপি সার গাছের গোড়ার চারদিকে (গোড়া থেকে ১০-১৫ সেমি দূরে) উপরি প্রয়োগ করে মাটির সাথে ভালো ভাবে মিশিয়ে দিতে হবে। সার প্রয়োগের সময় মাটিতে রসের অভাব হলে ঝাঁঝরি দিয়ে পানি সেচ দিতে হবে।

মাচা বা বাউনি দেয়া : শিমগাছ বাওয়ার সুযোগ যত বেশি পায়, ফলন তত বেশি হয়। তাই শিমগাছ যখন ১৫-২০ সেমি লম্বা হবে তখন গাছের গোড়ার পাশে বাঁশের ডগা (কঞ্চিসহ) মাটিতে পুঁতে দিতে হবে। এ ঝড়ে শিমগাছ ছড়িয়ে পড়ে ভালো ফুল ও ফল দিতে পারে। দেশীয় পদ্ধতিতেও বাঁশের মাচা বা ঝিকাগাছে অথবা ছনের ঘরের চালে শিমগাছ তুলে দেয়া যায়। এ ছাড়া বাঁশের চটা ও কঞ্চির সাহায্যে ইংরেজি ‘অ’ অরের মতো কাঠামো তৈরি করে জমিতে মাচা দিয়েও শিমগাছ থেকে ভালো ফলন পাওয়া যায়।

রোপনের আগে পরে করনীয় ও পরিচর্যা:
আষাঢ় থেকে ভাদ্র মাস পর্যন্ত দেশী শিমের বীজ বপন করার সময়। তবে শ্রাবণ মাস উপযুক্ত সময়। যে মাসেই বীজ বপন করা হোক, অগ্রহায়ণের শেষ বা কার্তিক শুরুর আগে কোনো গাছেই ফুল ও ফল ধরে না। ব্যতিক্রম বারমাসী জাত। দেশী শিমে যেহেতু আগাম, মাঝারি ও নাবী জাত আছে, তাই জাতের সঠিক তথ্য না জেনে চাষ করলে সময়মতো ফলন পাওয়া যায় না।
দেশী শিম ক্ষেত ছাড়াও বসতবাড়ির দেয়ালের পাশে, আঙিনার ধারে ছোট মাচায়, ঘরের চালে, পুকুর ও রাস্তার ধারে এবং ক্ষেতের আইলে চাষ করা যায়। ক্ষেতে চাষ ও মই দিয়ে জমি ভালোভাবে ঝুরঝুরে ও সমান করে নিতে হয়। এর পর ১০ ফুট দূরত্বে সারি করে সারিতে ৫ ফুট পর পর গর্ত বা মাদা তৈরি করতে হয়। দেড় ফুট চওড়া ও দেড় ফুট গভীর গর্ত খুঁড়ে গর্তের মাটির সাথে ১০ কেজি জৈব বা গোবর সার, ৫০ গ্রাম ইউরিয়া, ১০০ গ্রাম টিএসপি ও ৫০ গ্রাম এমওপি সার মিশিয়ে ৬ থেকে ৭ দিন রেখে দিতে হয়। এতে সার চারাগাছের গ্রহণ উপযোগী হতে পারে। অন্যান্য স্খানে লাগানোর জন্য একই রকম গর্ত ও সার ব্যবহার করতে হয়।
প্রতি শতক জমিতে ৪০-৫০ গ্রাম বীজ প্রয়োজন হয়। প্রতি মাদায় ৩-৪টি বীজ বপন করতে হয়। চারা গজালে ১ বা ২টি সুস্খ ও সবল চারা রেখে বাকিগুলো তুলে ফেলতে হয়। তবে বীজের স্বল্পতা থাকলে বা ভালো চারা রোপণ করতে চাইলে পলিব্যাগে বীজ থেকে চারা তৈরি করে নেয়া যায়। এতে বাছাই করা সুস্খ-সবল রোগ বা পোকামুক্ত শিমের চারা মাদায় রোপণ করা যায়। অন্য দিকে বৃষ্টির কারণে জমিতে বীজ বপন করতে না পারলে কিংবা জমিতে অন্য ফসল থাকলে সময়মতো পলিব্যাগে চারা তৈরি করা ভালো।
চারা গজানোর পর গাছে শাখা-প্রশাখা না আসা অথবা ১৫ থেকে ২০ সেন্টিমিটার লম্বা হলে গোড়ার মাটি কুপিয়ে আলগা রাখাসহ আগাছা জন্মাতে দেয়া ঠিক নয়। গাছ কিছুটা লম্বা হলে প্রথমে কাঠি ও পরে বাউনির জন্য মাচার ব্যবস্খা করতে হয়। বৃষ্টির পানি যাতে গাছের গোড়ায় জমে না থাকে সে জন্য নিষ্কাশনের নালা কেটে রাখতে হয়। বৃষ্টিতে গাছের গোড়ার মাটি ধুয়ে গেলে মাটি দিয়ে গোড়ার চার দিক এমনভাবে উঁচু করে দিতে হয় যাতে পানি সহজেই গড়িয়ে যায়। এ সময়ে গাছের গোড়ার দিকের প্রথম ২ থেকে ৩টি পার্শ্ব শাখা ছাঁটাই করে দিতে হয়। এই শাখাগুলো থেকে তেমন একটা ফল পাওয়া যায় না।
শিমের চারা বড় হতে থাকলে অর্থাৎ মাচায় উঠতে শুরু করলে ১ম বার ৫০ গ্রাম করে ইউরিয়া ও এমওপি সার উপরি প্রয়োগ করতে হয়। এর পর গাছের বৃদ্ধির ধরন অনুযায়ী ১৫ থেকে ২০ দিন পরপর আরো ২ বার একই হারে সার উপরি প্রয়োগ করা যায়। তবে গাছের বৃদ্ধি ভালো হলে বা পাতার সংখ্যা বেশি হলে ইউরিয়া উপরি প্রয়োগ না করাই ভালো।

শিমের রোগবালাই
পাতার রোগ : দেশী শিমের পাতায় কালো দাগ ও ফোস্কা পড়া দেখা দিলে মেনকোজেব জাতীয় ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হয়। আর পাতায় হলুদ মোজাইক রোগ হলে গাছটি তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হয়। রোগটি হয় জ্যাসিড বা সাদা মাছির কারণে। এ জন্য অন্যান্য সুস্খ গাছে ইমিডাক্লোরপিড বা ফেনথিয়ন গ্রুপের কীটনাশক স্প্রে করে জ্যাসিড বা সাদামাছি নিয়ন্ত্রণ করতে হয়।

গোড়া ও শিকড় পচা রোগ :
শিকড় পচা রোগ হলে আক্রান্ত গাছ তুলে বাকি গাছে ও মাটিতে ভালো করে কার্বেন্ডাজিম- জাতীয় ছত্রাকনাশক স্প্রে করতে হয়। শিমের গোড়া ও শিকড় পচা রোগ সাধারণত বর্ষার শুরুতে বা অতি বর্ষণের ফলে গোড়ায় পানি জমলে হয়। তবে মাঝে মাঝে আবহাওয়ার আর্দ্রতা বেড়ে গেলে ও উচ্চ তাপমাত্রায় গোড়া পচা রোগের প্রকোপ বাড়ে। গাছের বৃদ্ধির যেকোনো অবস্খাতেই এ রোগ হতে পারে। মাটির ঠিক ওপরে গাছের কাণ্ডে লালচে বাদামি দাগ পড়ে। ধীরে ধীরে এই দাগ বিস্তার লাভ করে। বেশি হলে শিকড়েও ছড়িয়ে পড়ে। আক্রান্ত অংশ আস্তে আস্তে শুকিয়ে যায়, ফলে গাছ দুর্বল হয়। ফলন কম হয়। কখনো কখনো গাছ মরেও যেতে পারে। চারা অবস্খায় আক্রান্ত হলে চারা মারা যায়। অন্য সুস্খ গাছে বিশেষ করে গাছের গোড়ায় কপারযুক্ত ছত্রাকনাশক বা বাড়িতে তৈরি বোর্দো মিশ্রণ ৭ দিন পরপর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করলে সুফল পাওয়া যায়।

মরিচা রোগ :
দেশী শিমগাছের বয়স্ক অবস্খায় মোজাইক বা মরিচা রোগ দেখা যায়। এটি ছত্রাকঘটিত রোগ। মাঘ মাসের শুরুর দিকে বিশেষ করে এ সময় দু-এক পশলা বৃষ্টি হলে বা বেশি কুয়াশা হলে এই রোগ দেখা দেয়। শিমগাছের পাতায় বিশেষ করে নিচের দিকের পুরনো পাতায়, কাণ্ডে ও ডগায় বা কখনো কখনো শুঁটিতে মরিচা রোগের আক্রমণ দেখা যায়। এর আক্রমণে ছোট ছোট বাদামি ধূসর রঙের দাগ পড়ে পাতায়। পরে দাগগুলো আকারে বাড়ে, গোলাকার বা কোণবিশিষ্ট হয় এবং গাঢ় বাদামি রঙ ধারণ করে। শেষে বড় দাগগুলো কালো রঙে রূপান্তরিত হয়। সাধারণত দাগগুলো একত্রিত হয়ে এক জায়গায় থাকে এবং অনেক সময় পরস্পর মিশে গিয়ে বড় দাগের সৃষ্টি করে। মরিচা রোগ প্রতিকারের ভালো উপায় হচ্ছে রোগ প্রতিরোধী জাতের চাষ করা। বারি ও ইপসা জাতের শিমগুলো এই রোগ প্রতিরোধী। একবার এ রোগে গাছ আক্রান্ত হলে রোগ দমন করা যায় না। গাছ তুলে পুড়িয়ে ফেলতে হয়।

হলুদ মোজাইক রোগ:
দেশী শিমের আরেকটি রোগ প্রায়ই দেখা যায়, তা হলো হলুদ মোজাইক রোগ। এ রোগে প্রথমে কচি পাতায় ছাড়া ছাড়াভাবে হলদে দাগ দেখা যায়। দাগগুলো আস্তে আস্তে পুরো পাতায় ছড়িয়ে পড়ে। হলদে হয়ে যাওয়া পাতার কিছু কিছু অংশ সবুজই থাকতে পারে। আক্রান্ত হওয়ার পর গজানো নতুন পাতায় হলদে ভাব আরো বেশি দেখা যায়। কখনো কখনো পাতার বিকৃতিও ঘটে। পাতা আকারে ছোট হয় ও কিছুটা কুঁচকে যায়। এক ধরনের সাদামাছি এই রোগ ছড়ায়। যেকোনো অন্তর্বাহী কীটনাশক (যেমন-বাইফেনথ্রিন বা ইমিডাক্লোরপিড) ১ থেকে ২ মিলিলিটার প্রতি লিটার পানিতে মিশিয়ে স্প্রে করে পোকা ও রোগ কিছুটা নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হয়। এ ছাড়া রোগমুক্ত মাঠ বা গাছ থেকে বীজ সংগ্রহ করতে হয় পরবর্তী ফসলের জন্য। আক্রান্ত ক্ষেতের আশপাশের শিমজাতীয় সব গাছে (ফরাসি শিম, ঝাড় শিম, চওড়া শিম, চারকোনা শিম, তলোয়ার শিম, মটরশুঁটি, সয়াবিন, মেথি, খেসারিশাক, ছোলাশাক ও বরবটি) একই সাথে কীটনাশক স্প্রে করা উচিত। কীটনাশক স্প্রে করার আগে সংগ্রহযোগ্য সব ফল বা শুঁটি সংগ্রহ করে নিতে হয় এবং ১৫ দিনের মধ্যে গাছ থেকে কোনো ফসল সংগ্রহ করা যাবে না।

জাব পোকা:
দেশী শিমে জাব পোকার আক্রমণ সবচেয়ে বেশি। ফুল বের হওয়ার সময় এদের আক্রমণ বেশি দেখা যায়। কেরোসিন মিশ্রিত ছাই পাতায় ছিটিয়ে এই পোকা নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়। তবে গাছের গোড়া ও মাচার খুঁটি, যা মাটি সংলগ্ন থাকে সেখানেও এই ছাই ছিটিয়ে দিতে হয় যাতে পিঁপড়া খুঁটি বা গাছ বেয়ে উঠতে না পারে। পিঁপড়া জাব পোকার গা থেকে নি:সৃত এক প্রকার আঠালো পদার্থকে খাবার হিসেবে গ্রহণ করে। তাই শিমগাছে জাব পোকা দেখা দিলে পিঁপড়াও নিয়ন্ত্রণ করতে হয়। আক্রমণ বেশি হলে ইমিডাক্লোরপিড- জাতীয় কীটনাশক ১৫ দিন পর ২ থেকে ৩ বার স্প্রে করতে হয়।

শুঁটির মাজরা পোকা:
দেশী শিমের একটি বড় সমস্যা শুঁটির মাজরা পোকা। বাদামি রঙের পূর্ণ বয়স্ক পোকা ফুল বা কচি শিমের গায়ে ডিম পাড়ে। ডিম ফুটে বাচ্চা বা কিড়া বের হয়ে শুঁটির ভেতরে প্রবেশ করে কচি বীজ ও শাঁস খায়। ভেতরেই মল ত্যাগ করে। এ অবস্খায় শুঁটি কিছুটা বড় হয়। কিন্তু শিমের বাণিজ্যিক মূল্য একেবারেই থাকে না। ফুলের কুঁড়িতে ডিম পাড়লে ডিম ফুটে বাচ্চা বের হওয়ার পর পুষ্পমঞ্জরি খেতে থাকে। পরে পাতায় ছোট ছোট জালের মতো তৈরি করে। পাতা, ফুল ও কচি শুঁটি দিয়ে বাসার মতো তৈরি করে সেখানে লুকিয়ে থাকে। এই পোকা নিয়ন্ত্রণের জন্য শস্যপর্যায় অবলম্বন করা উচিৎ। অর্থাৎ পরপর দুই-তিন মৌসুম একই জমিতে দেশী শিমের চাষ করা থেকে বিরত থাকতে হয়। এতে এই পোকার জীবনচক্র বাধাপ্রাপ্ত হয়। ওই সময়ে কোনো ডালজাতীয় শস্যও চাষ করা যাবে না। কারণ ডাল শস্য এই পোকার বিকল্প পোষক। প্রতি গাছে বা প্রতি বর্গমিটারে যদি ১ থেকে ৩টি পোকার আক্রমণ দেখা যায় তাহলে ফেনিট্রোথিয়ন গ্রুপের কীটনাশক (৫০ ইসি) প্রতি লিটারে ২ মিলিলিটার কিংবা সাইপারমেথ্রিন গ্রুপের কীটনাশক প্রতি লিটারে ১ মিলিলিটার হিসেবে মিশিয়ে স্প্রে করতে হয়। স্প্রে করার আগে সংগ্রহ করার মতো শিম সংগ্রহ করে পরবর্তী ১৫ দিনের মধ্যে কোনো শিম সংগ্রহ করা উচিত নয়।
দেশী শিম প্রতি সপ্তাহে সংগ্রহ করে বাজারে বিক্রি করতে হয়। জাতভেদে কার্তিক মাস থেকে শুরু করে চৈত্র মাস পর্যন্ত শিম সংগ্রহ করা যায়। ভালোভাবে পরিচর্যা করা হলে শতকপ্রতি প্রায় ৪০ কেজি শিম পাওয়া যায়। আবার শুকনো শিম বা শুঁটির বীজ সংগ্রহ করে শুকিয়ে সংরক্ষণ করা যায়। প্রতি বিঘা দেশী শিম চাষের জন্য পাঁচ হাজার থেকে ছয় হাজার টাকা খরচ হতে পারে। আগাম শিম বাজারে তুলতে পারলে প্রতি কেজি কমপক্ষে ২০ টাকা হিসেবে ১ বিঘায় উৎপাদিত প্রায় ১৩০০ কেজি শিমের দাম ২৬০০০ টাকা। অর্থাৎ প্রতি বিঘায় প্রায় হাজার বিশেক টাকা লাভ হয়। তবে ভরা মৌসুমে সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়ায় দাম কমে আসে এবং লাভও কমতে থাকে।

ফসল সংগ্রহ : শিমের কচি শুঁটি, অপক্ব বীজ এবং পরিপক্ব বীজ সবজি হিসেবে ব্যবহৃত হয়। সাধারণত একই ফসল থেকে প্রথম দিকে গুঁটি ও শেষের দিকে বীজ সংগ্রহ করা হয়ে থাকে। গাছ তিন মাসের বেশি সময়ব্যাপী ফল দিতে থাকে।

ফলন : প্রতি শতকে ৩০-৪০ কেজি (হেক্টর প্রতি ৮-১০ টন) শিম পাওয়া যায়।
লেখক: খোন্দকার মেসবাহুল ইসলাম, কৃষিবিদ

Top