যশোরের নাভারণে সয়াবিন থেকে দুধ উৎপাদন হচ্ছে

যশোরের নাভারণে সয়াবিন থেকে দুধ উৎপাদন হচ্ছে

সয়াবিন থেকে তেল হয় সবাই জানি, কিন্তু সয়াবিন থেকে যে  দুধ হয় এই ধারণা একেবারেই নতুন। অবিশাস্য হলেও সত্যি যশোরের শার্শা উপজেলার নাভারণ সয়াফুড প্রসেসিং সেন্টারে আধুনিক প্রযুক্তির মাধ্যমে সয়াবিন থেকে দুধ তৈরি শুরু হয়েছে। বেসরকারি সংস্থা জাপান বাংলাদেশ কালচারাল এক্সচেঞ্জ অ্যাসোসিয়েশনের (জেবিসিইএ) উদ্যোগে এই দুধ তৈরি করা হচ্ছে। এই সংস্থাটির একমাত্র কার্যালয়ই এটি। সয়াদুধ নামে এই দুধের  বাণিজ্যিক উৎপাদন খুব শিগগিরই  শুরু হবে বলে সংস্থা সূত্রে জানা গেছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইনস্টিটিউট অব নিউট্রিশন অ্যান্ড ফুড সায়েন্স এবং জাপানের কাজাওয়া এডুকেশন ইনস্টিটিউশন অব নিউট্রিশন ও জাপান মিনিস্ট্রিয়াল ফুড সেফটির সূত্র উদ্ধৃত করে জেবিসিইএ জানায়, সয়াদুধে গরুর দুধের চেয়ে আমিষের পরিমাণ ১২ গুণ বেশি। এতে লেসিথিন নামে এক প্রকার উপাদান আছে যা স্মরণ শক্তি বাড়াতে কাজ করে। প্রতি ১০০ গ্রাম সয়াবিনে পুষ্টি উপাদানের মধ্যে আছে ৪৩ দশমিক ২ গ্রাম আমিষ। এই আমিষ আটটি অ্যামানো অ্যাসিড সম্পন্ন উদ্ভিদ ও প্রাণীজ আমিষের সমমানের। এ ছাড়া আছে শরীরে শক্তি উৎপাদনকারী চর্বি, দাঁত ও হাড় গঠন এবং হাড়ের ক্ষয় প্রতিরোধকারী ক্যালসিয়াম, রক্তশূন্যতা, ও শরীরের দুর্বলতা প্রতিরোধকারী লৌহ, রাতকানা ও চক্ষুরোগ প্রতিরোধক ভিটামিন ‘এ’, হজমশক্তি বৃদ্ধিকারক ভিটামিন ‘বি’। 

টেক্সাস উইমেনস ইউনিভার্সিটি ইনস্টিটিউট অব হেলথ সায়েন্সেস হাইটন সেন্টারের ডাক্তার জন র‌্যাডেলিফ ইন্টারনেট স্বাস্থ্যবর্তায় বলেছেন, যারা নিরামিষভোগী বা গরুর দুধে যাদের অ্যালার্জি আছে তারা সয়াদুধ খেতে পারেন। এর স্বাদ ভালো। হাড় গঠন ও রক্ষণাবেক্ষণের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান ক্যালসিয়াম ও ভিটামিন ‘ডি’ এই দুধে পাওয়া যায়।

জেবিসিইএ জানায়, বাংলাদেশের ৭০ ভাগ মানুষ গরিব হওয়ায় তারা পর্যাপ্ত পুষ্টিকর খাদ্য কিনে খেতে পারে না। এতে তারা পুষ্টিহীনতায় ভোগে। বিশেষ করে শিশুরা বেশি পুষ্টিহীনতায় আক্রান্ত হয়। পাঁচ-সাত বছর বয়সের নিচের ৬৭ শতাংশ শিশু অপুষ্টিতে ভোগে। এ ছাড়াও কিশোর-কিশোরী, গর্ভবতী ও স্তন্যদায়ী মা ও গরিব শ্রেণীর মানুষ পুষ্টিহীনতায় ভোগে। গর্ভবতী মায়ের অপুষ্টিজনিত কারণে রুগ্ন দুর্বল ও বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম গ্রহণ করে। মানুষকে এ অবস্থা থেকে মুক্ত করতে জেবিসিইএ জাপান পোস্টের অর্থায়নে ২০০৩ সালে শার্শা উপজেলার নাভারণে সয়াবিন থেকে দুধ তৈরি শুরু করে।

সংস্থার চিফ প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর সনৎ কুমার ভাস্কর জানান, উন্নত প্রযুক্তির অভাবে এতদিন স্থানীয় প্রযুক্তি শিল-পাটায় বেটে দুধ তৈরি করা হচ্ছিল। কিন্তু এ পদ্ধতি শ্রমসাধ্য বলে কেউ এ দুধ তৈরিতে আগ্রহী হচ্ছিল না। ভারত থেকে সংস্থার উদ্যোগে সয়া মিল্ক মেশিন আমদানি করা হয়েছে। এর দাম ছয় লাখ টাকা। এই মেশিনে ঘন্টায় ৩৪ লিটার দুধ উৎপাদন করা হচ্ছে।

তিনি জানান, ৩৪ লিটার দুধ তৈরিতে সয়াবিন লাগে চার কেজি। প্রতি কেজি সয়াবিনের দাম সর্বোচ্চ ৮০ টাকা হিসেবে চার কেজি সয়াবিনের দাম ৩২০ টাকা। তাদের মেশিনে উৎপাদিত সয়াদুধ নিজেদের দোকান থেকেই ৩০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছেন। যেখানে গরুর দুধের কেজি ৪০ থেকে ৫০ টাকা। অবশ্য যশোর শহরের বারান্দীপাড়াস্থ ঢাকা রোডের একটি দোকানে এই সংস্থারই কাচা সয়াবিন বিক্রি হচ্ছে সাড়ে তিনশ’ থেকে চারশ’ টাকা কেজি দরে।

জেবিসিইএ’র কান্ট্রি ম্যানেজার মনিরুজ্জামান টিটু জানান, মাস খানেকের মধ্যে নতুন সয়াবিন উঠবে। ওই সময়

থেকে সয়াদুধের বাণিজ্যিক উৎপাদন শুরু করা হবে। গরুর দুধের দাম কেজি প্রতি ৫০ টাকা হওয়ায় অপেক্ষাকৃত কম দামের সয়াদুধের প্রতি মানুষের দারুণ আগ্রহ রয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যাপকহারে মানুষ এ দুধের চাহিদার কথা জানিয়েছেন। বাণিজ্যিক উৎপাদনে যাবার আগে দুধ মান সম্পন্ন করার জন্য সংস্থার সাতজন কর্মীকে প্রশিক্ষণ দেয়া হয়েছে। প্রশিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন ঢাকার হা্‌ই-কিউ সয়াফুড ইন্ডাস্ট্রির স্বত্বাধিকারী মনিরুল ইসলাম। তিনি সয়া দুধ তৈরি, এর পুষ্টি গুণ ও চাহিদা সম্পর্কে  বলেন, সঠিক ভাবে দুধ তৈরি করে মানুষের কাছে পৌছাতে পারলে দেশের গরিব জনসাধারণ অপুষ্টির অভিশাপ থেকে মুক্তি পাবে।