দেশি পাবদার চাষ প্রযুক্তি

pabda fish

পাবদা মাছ একটি বিলুপ্ত প্রজাতির মাছ। এই মাছ অত্যন- সুস্বাদু এবং জনপ্রিয়। আমাদের দেশে বেশ আগে হাওড়-বাঁওড় -বিলে এই মাছটির পাওয়া যেত। কালের বিবর্তনে প্রাকৃতিক অভয়ারণ্য নষ্ট হয়ে যাওয়ার ফলে এই মাছটি আমাদের দেশ থেকে বিলুপ্ত হতে চলেছে। আমরা এই মাছটিকে ব্যাপকভাবে উৎপাদনের জন্য অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে ২০০২ সালে ব্যাপকভাবে পোনা উৎপাদনে সক্ষম হয়েছি। এই মাছটি উৎপাদন করতে গিয়ে বিভিন্ন হাওড়-বাঁওড় থেকে জীবিত ব্রুড মাছ সংগ্রহ থেকে শুরু করে, ভৌত অবকাঠামো গড়ে তোলা দক্ষ জনবল তৈরি করাসহ ২ বছর ধরে অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মাধ্যমে পোনা উৎপাদন ছিল অত্যন- ঝুঁকিপূর্ণ ও ব্যয় বহুল একটি কাজ। সুনামগঞ্জ, নেত্রকোণার হাওড়-বাঁওড় থেকে ব্রুড মাছ সংগ্রহ ছিল এক বিরাট ঝুঁকির কাজ। ৫% বেশি ব্রুড মাছ বাঁচানো সম্ভব হয়েছিল। তারপর এই মাছগুলোকে কৃত্রিম খাবারে অভ্যস- করারও ছিল এক কঠিন চ্যালেঞ্জ। কারণ একটি পুষ্টিকর খাবার ছাড়া ব্রুড মাছ কখনও ভালমানের বাচ্চা জন্ম দিতে পারে না। আর সে জন্য এই মাছকে ধীরে ধীরে কৃত্রিম খাবারে অভ্যস- করানো ছিল এক বিরাট সাধনা এবং অভিজ্ঞতাও বটে। প্রতিটি দিনেই যেন এক নতুন নতুন অভিজ্ঞতায় পুলোকিত বোধ করছিলাম। অবশেষে মাছগুলো কৃত্রিম খাবারে অভ্যস- হল। অন্য কারো পরামর্শ বা প্রযুক্তি ছাড়াই ২০০০ সালে পরীক্ষামূলকভাবে পোনা উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছিলাম যা আমাদের পরিশ্রমকে সার্থক করে তুলেছে। তারপর ব্রুড থেকে রেনু, রেনু থেকে পোনা উৎপাদন হল। সারা দেশে পোনা বাজারজাত হল। এ থেকে সব খামারিরাই কৃত্রিম খাবারে অভ্যস- পোনা পেল। যা থেকে পরবর্তিতে ব্রুড মাছের সহজলভ্যতা এল। কিন্তু এর পেছনে কত গভীর নিরলস পরিশ্রম করতে হয়েছে তা শুধু আমিই জানি। অবশ্য আমি ব্যবসাও করেছি। এখন স্বল্প পরিসরে কৃত্রিম প্রজননের মাধ্যমে অতিসহজেই আমার প্রযুক্তিতে যে কেউ চাহিদা মাফিক পোনা উৎপাদন করতে সক্ষম হবে বলে আমার বিশ্বাস।

প্রজননক্ষম মাছ সংগ্রহ ও পরিচর্যা : পরীক্ষায় দেখা গেছে যে, ১০/১১ মাস বয়সে একটি পাবদা মাছ প্রজননে সক্ষম হয়। সুস্থ ও সবল মাছ শতাংশ প্রতি পুরুষ ও স্ত্রী মাছ ৫০ : ৫০ অনুপাতে ৭০/৮০টি মজুদ করে নিয়মিতভাবে দেহের ওজনের ৫% হারে সম্পূরক খাবার দিতে হয়। ৩০% ফিস মিল, ৩০% সরিষার খৈল, ৩০% অটোকুড়া, ১০% ভূষি ও ভিটামিন প্রিমিক্্র সহকারে সম্পূরক খাবার তৈরি করা যায় অথবা বাজারের কৈ মাছের ফিড কাওয়ালেও চলবে।

প্রজননের জন্য উপযোগী স্ত্রী ও পুরুষ মাছ বাছাই : সাধারণত এপ্রিলের মাঝামাঝি থেকে আগষ্ট মাস পর্যন- পাবদা মাছের প্রজনন কাল। এই সময়ে স্ত্রী মাছের পেটে ডিম ভর্তি থাকে। এছাড়াও পাবদা স্ত্রী মাছের পাখনার কাঁটাগুলোর খাঁজগুলো খুব স্পষ্ট নয় যতটা না পুরুষের ক্ষেত্রে। প্রজনন করার জন্য মাছ ও মাছ বাছাইয়ের জন্য স্ত্রী মাছের উদরে ডিম ভর্তি দেখে পরিপক্কতা সম্পন্ন মাছ বাছাই করে নিতে হয়।

হরমোন ইনজেকশনের দ্রবণ তৈরি এবং ইনজেকশন দেওয়ার পদ্ধতি : কৃত্রিম প্রজননের জন্য প্রথমে মাছ বাছাই করতে হয়। এক্ষেত্রে সমপরিমাণ পুরুষ ও স্ত্রী মাছ বাছাইয়ের পর পি.জি. দ্রবণের ইনজেকশন দিতে হয়।

১. প্রথমে প্রজননক্ষম উপযোগী স্ত্রী ও পুরুষ মাছ সমন অনুপাতে হাপাতে ছাড়তে হবে।

২. প্রথম ইনজেকশনের সময় শুধুমাত্র স্ত্রী মাছকে ২/৩ মিঃ গ্রাঃ হারে অর্থাৎ ১ কেজি মাছের জন্য ৩ মিঃ গ্রাঃ পি.জি. এর দ্রবণ পাখনার কাটার নিচে প্রয়োগ করতে হবে।

৩. প্রথম ইনজেকশনের ৬ ঘন্টা পর প্রতি কেজি স্ত্রী মাছের জন্য ৪/৬ মিঃ গ্রাঃ হারে ২য় ইনজেকশন এবং একই সাথে ২য় ইনজেকশনের সময় পুরুষ মাছকে ৪/৬ মিঃ গ্রাঃ হারে ইনজেকশন দিতে হবে। ২য় ইনজেকশনের ৭/৮ ঘন্টার মধ্য সাধারণত প্রাকৃতিকভাবে প্রজনন ক্রিয়ার মাধ্যমে ডিম ছাড়ে।

pabda fish
দুটি পদ্ধতিতে পাবদা মাছের ডিম সংগ্রহ করা যায়-

১. হাপা পদ্ধতি : প্রথমে ১ সেঃ মিঃ ব্যাস ফাঁক বিশিষ্ট পলিথিন জাতীয় জাল দিয়ে একটি হাপা তৈরি করতে হবে। হাপার মাপ হবে দৈর্ঘ্যে ১২ ফুট প্রস্থে ৪ ফুট। উপরের অংশ খোলা হাপাটিকে এমনভাবে সিস্টার্ণে স্থাপন করতে হবে যেন সম্পূর্ণ হাপাটির নীচের অংশ অর্থাৎ তলার অংশ সিস্টার্ণের তলা থেকে কমপক্ষে ৬ ইঞ্চি উপরে থাকে। এরপর পুরুষ ও স্ত্রী মাছকে ইনজেকশন করে ১ : ১ অনুপাতে হাপায় ছাড়তে হবে। পরে পানির কৃত্রিম ঝর্ণা দিয়ে স্রোতের সৃষ্টি করতে হবে। এই জাতীয় এক একটি হাপায় ৬০/৭০ জোড়া পাবদা মাছ ইনজেকশন করে ছাড়া যেতে পারে। ইনজেকশন এমন সময়ে করতে হবে যেন মাছগুলো গভীর রাতে ডিম দেয়। কারণ, রাত যত গভীর হবে পাবদা মাছে ডিম দিতে তত স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করবে। গভীর রাত থেকে ভোর পর্যন- মাছগুলো ডিম দেয়া শেষ করবে। ডিম দেয়া শেষ হলে ব্রুড মাছসহ হাপাটিকে সাবধানের সাথে তুলে নিতে হবে। যেহেতু হাপাটিতে ব্যবহৃত জালটি ১ সেঃ মিঃ ফাঁক বিশিষ্ট তাই মাছগুলো ডিম দেয়ার সাথে সাথে হাপার জালের ফাঁক দিয়ে ডিমগুলো সিস্টার্ণের তলায় পড়ে যাবে। পাবদা মাছের ডিম সামান্য আঠালো থাকা সত্ত্বেও হাপাটি পলিথিন জাতীয় জালের ব্যবহারের জন্য হাপার জালে ডিম আটকাবে না এব