কীটনাশক জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ যেভাবে বিপন্ন করছে

কীটনাশক জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ যেভাবে বিপন্ন করছে

কীটনাশক জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ যেভাবে বিপন্ন করছে

শাকসবজি আমাদের দৈনন্দিন খাদ্য তালিকায় এক উল্লেখযোগ্য স্থান দখল করে আছে। বাংলাদেশের মাটি ও আবহাওয়ায় বিভিন্ন মৌসুমে প্রচুর শাকসবজি উৎপন্ন হয়। এসব শাকসবজিতে প্রতি বছরই বিভিন্ন পোকামাকড় ও রোগবালাইয়ের আক্রমণ হয় এবং কোনো কোনো সময় এর ফলে মারাত্মক ক্ষতি হয়। স্মর্তব্য, বাংলাদেশে শুধু পোকামাকড় দ্বারাই প্রতি বছর প্রায় ১০ থেকে ১৫ শতাংশ ফসল নষ্ট হচ্ছেন, যার মূল্য প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা।

শাকসবজিকে রোগ ও পোকামাকড়ের হাত থেকে রক্ষার জন্য কৃষক প্রতিনিয়ত যথেচ্ছভাবে যত্রতত্র মাত্রাহীন পরিমাণে বিভিন্ন প্রকার কীটনাশক ব্যবহার করে যাচ্ছেন। এক জরিপে দেখা গেছে, বাংলাদেশে বছরে প্রায় আট হাজার মেট্রিক টন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়। এর অধিকাংশ ব্যবহৃত হচ্ছে শাকসবজিতে। শতকরা ১০০ জন কৃষক কীটনাশক নিরাপদভাবে ব্যবহার করেন না এবং ৮০ শতাংশ কৃষক ফসলের অর্থনৈতিক ক্ষতির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছার আগেই কীটনাশক প্রয়োগ করেন। শাকসবজিতে এরূপ নির্বিচারে এলোপাতাড়ি কীটনাশক ব্যবহারের ফলে প্রতিনিয়ত আমাদের স্বাস্থ্য ও পরিবেশ বিপন্ন হয়ে পড়েছে। অপরদিকে কৃষকের আর্থিক ক্ষতি ক্রমশ বেড়েই চলেছে।

বর্তমান বিশ্বে কীটনাশক এক শত্রু হিসেবে একের পর এক নীরবে ধ্বংস করে চলেছে মানুষের দেহকে। এমন কোনো কীটনাশক নেই, যা মানবদেহের জন্য কমবেশি বিষাক্ত নয়। প্রায় প্রতিটি কীটনাশকেরই রয়েছে অল্পবিস্তার অবশিষ্ট প্রভাব (Residual effect)। অধিকাংশ শাকসবজি অনিয়মিতভাবে ক্ষেত থেকে বিভিন্ন সময় সংগ্রহ বা তোলা হয় এবং কাঁচা বা অল্প রান্না করে খাওয়া হয়। আর এ কারণেই কীটনাশক প্রয়োগকৃত শাকসবজি থেকে আমরা প্রতিদিন ভয়াবহ বিষাক্ত দ্রব্যটিকে উদরস্থ করে ক্রমশ বিভিন্ন রোগে আক্রান্ত হচ্ছি। পেটের বিভিন্ন পীড়া এর অন্যতম কারণ।

কোনো কোনো কীটনাশকের অবশেষ প্রভাব এত বেশিদিন থাকে যে, একবার আমাদের দেহে প্রবিষ্ট হলে, তা সহজে সম্পূর্ণরূপে নষ্ট হয়ে যায় না। বরং এ জাতীয় কীটনাশকের কণা দেহে ক্রমে সঞ্চিত হতে হতে আমাদের বিকলাঙ্গ বা বন্ধ্যা করে তোলে। নিয়মনীতিহীন কীটনাশকের ব্যবহার এ পরিস্থিতিকে আরও বেশি জটিল করে তুলেছে। আর পরিবেশ দূষণ তো রয়েছেই। একদিকে কীটনাশক ব্যবহার করে চাষিরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, অন্যদিকে পরাগায়নে সাহায্যকারী বিভিন্ন পোকামাকড়কে আর ক্ষেতে দেখা যাচ্ছে না। যে কারণে ফলনও মারাত্মকভাবে কমে যাচ্ছে।

এসব সমস্যার কথা চিন্তা করে কৃষিতে অগ্রসর অনেক দেশে এখন কীটনাশকের ব্যবহার কমিয়ে বিকল্প দমন ব্যবস্থার ওপর জোর দেয়া হচ্ছে। ইন্দোনেশিয়ায় প্রচলিত ৬৪টি কীটনাশকের মধ্যে ১৯৮৬ সালে ৫৭টি কীটনাশক নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়। এতে তাদের উৎপাদন কমেনি বরং ক্ষতিকর পোকামাকড়ের সংখ্যা কমেছে। কেননা কীটনাশকের সহজলভ্যতা হ্রাস পাওয়ায় এর ব্যবহার কমেছে এবং ক্ষেতে বিভিন্ন উপকারী পোকামাকড়ের সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, যারা প্রকৃতপক্ষে ওইসব ক্ষতিকর পোকা বা তাদের ডিম ও কীড়া নষ্ট করে। সম্প্রতি ভারত, তাইওয়ান, কলম্বিয়া ইত্যাদি দেশ ফসলের পোকামাকড় দমনে জৈবিক নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে কীটনাশকের ব্যবহার বিপুল পরিমাণে কমিয়ে আনতে সক্ষম হয়েছে, অথচ এতে ফসলের উৎপাদনও বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু উৎপাদন খরচ কমে গেছে।

এ দেশেও বিভিন্ন ফসল বিশেষত শাকসবজির পোকামাকড় দমনে সমম্বিত বালাই ব্যবস্থাপনা (আইপিএম) পদ্ধতি ব্যবহারের মাধ্যমে কীটনাশকের ব্যবহার একবারেই নূ্যনতম পর্যায়ে নিয়ে আসা দরকার অথবা কীটনাশকের ব্যবহার পরিহার করা উচিত।

মোঃ আবদুর রহমান