ইউরোপে যাচ্ছে সিলেটের শিম

ইউরোপে যাচ্ছে সিলেটের শিম

কৃষি উদ্যোক্তা কৃষি বিষয়ক সংবাদ কৃষির তথ্য পণ্য পরিচিত সাম্প্রতিক পোষ্ট

ইউরোপে যাচ্ছে সিলেটের শিম

চোখের দৃষ্টিসীমা যত দূর যায়, বিস্তৃত মাঠজুড়ে যেন সবুজের চাদর বিছিয়ে রেখেছে শিমের ক্ষেত। সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় যুগ যুগ ধরে শীত মৌসুমের চিত্র এমনই।

ইউরোপে যাচ্ছে সিলেটের শিম
ইউরোপে যাচ্ছে সিলেটের শিম

কৃষকের পাশাপাশি নারীরাও বাসাবাড়ির আঙিনায় মাচা বেঁধে রোপণ করে শিম। স্থানীয়ভাবে এটি গোয়ালগাদ্দা উরি বা শিম নামে পরিচিত। বিশেষ জাতের সুস্বাদু এ শিমের সুনাম দেশের গণ্ডি পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে ইউরোপ পর্যন্ত। গোয়ালগাদ্দা শিম মূলত সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলায় চাষ হলেও এখন বিস্তৃত হয়েছে সিলেট সদর ও দক্ষিণ সুরমা উপজেলার কিছু এলাকায়। এসব এলাকায় শীত মৌসুমে শিমের মধ্যে গোয়ালগাদ্দার চাষই বেশি হয়। প্রতিবছরের মতো এবারও এ শিমের ভালো ফলন হয়েছে। গত দুই সপ্তাহ ধরে বাজারে আসতে শুরু করেছে এ শিম। ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে এ শিমের চাহিদা থাকলেও গত দুই বছর নানা জটিলতায় রপ্তানি হয়নি আশানুরূপ। তবে আগামী সপ্তাহ থেকে রপ্তানি শুরু হবে জানিয়ে সংশ্লিষ্টরা বলেছে, এ বছর গোয়ালগাদ্দা শিম রপ্তানি বাড়বে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ বছর সিলেটে দুই হাজার ৬৬৪ হেক্টর জমিতে শিমের ফলন হয়েছে। এর মধ্যে শুধু গোয়ালাগাদ্দা শিমই হয়েছে এক হাজার ৮৬৫ হেক্টর জমিতে।

উপজেলার ঢাকা দক্ষিণ চক্রবর্তীপাড়া গ্রামের মো. আব্দুস শহীদ দীর্ঘদিন ধরে শিম চাষের সঙ্গে যুক্ত রয়েছেন। শিম চাষ করে যা আয় হয়, তা দিয়ে অনায়াসে তার পুরো বছর চলে যায়। তিনি বলেন, ‘১৭ বছর ধরে প্রতি শীতেই শিম চাষ করি। শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত পুরোটা সময় নিজে তদারকি করি। ‘ অন্য ব্যস্ততার কারণে এবার কম জমিতে চাষ করেছেন জানিয়ে তিনি আরো বলেন, এ বছর নিজে ১৫ শতক জমিতে এবং তাঁর ভাই ৩০ শতক জমিতে গোয়ালগাদ্দা শিমের চাষ করেছেন। সপ্তাহ দুই আগে থেকে শিম বিক্রি শুরু করেছেন জানিয়ে তিনি বলেন, ‘শুরুতে ১০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করা গেছে। এখন যত সময় যাচ্ছে দাম তত কমছে। সর্বশেষ ৩৫ টাকা দরে বিক্রি করেছি। ‘

উপজেলার বখতিয়ারঘাট গ্রামের আকবর আলী শিম ফলিয়েছেন ৬০ শতক জমিতে। তিনি বলেন, এবার ফলন ভালো হয়েছে। বিক্রিও শুরু করেছেন। তবে গত কয়েক দিনের বৃষ্টিতে শিমের কিছুটা ক্ষতি হয়েছে।

সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার আনাচে-কানাচে ফলন হওয়া এই শিম প্রথমে আনা হয় স্থানীয় পুরকায়স্থ ও লক্ষ্মণাবন্দ চৌধুরী বাজারে। সেখান থেকে পাইকাররা ট্রাক ও পিকআপ ভ্যানে করে নিয়ে যায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তে। চৌধুরী বাজারে সপ্তাহে সোম ও বৃহস্পতিবার এবং পুরকায়স্থ বাজারে রবি ও বুধবার বাজার বসে। এ ছাড়া দক্ষিণ সুরমা উপজেলার শিম আনা হয় রাখালগঞ্জ বাজারে। এসব বাজারে ভোর হলেই ক্ষেত থেকে সদ্য তোলা শিম নিয়ে আসতে শুরু করে চাষিরা। সকাল ৭টার মধ্যেই টন টন গোয়ালগাদ্দার রীতিমতো ছোট ছোট টিলা জমে ওঠে বাজারগুলোতে।

বাজারের ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, অন্যান্য বছরের তুলনায় এবার ফলন কিছুটা কম হওয়ায় ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। চৌধুরী বাজারের ব্যবসায়ী ফখরুল ইসলাম বলেন, ফলন কিছুটা কম হওয়ায় এবার শুরু থেকে ভালো দাম পাওয়া যাচ্ছে। গত সোমবার গোয়ালগাদ্দা শিম কেজিপ্রতি ৩০ থেকে ৩৩ টাকা পাইকারি দরে বিক্রি করেছি।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিলেটের গোলাপগঞ্জের গোয়ালগাদ্দা শিম ইউরোপ ও আমেরিকায় ব্যাপক চাহিদা থাকলেও রপ্তানি করা সম্ভব হচ্ছে না। দুই বছর ধরে সিলেট থেকে সরাসরি শিম রপ্তানি বন্ধ রয়েছে। যদিও এ সময়ে নারায়ণগঞ্জ ও নরসিংদীর রপ্তানিকারকরা বিশেষ জাতের এ শিম রপ্তানি করেছে।

এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির রপ্তানি সাবকমিটির আহ্বায়ক ও এক্সপোর্ট অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি হিজকিল গুলজার বলেন, গত দুই বছর রপ্তানি বন্ধ থাকলেও আগামী সপ্তাহ থেকে পুরোদমে গোয়ালগাদ্দা শিম রপ্তানি শুরু হবে। এ লক্ষ্যে ঢাকার একটি টিম সম্প্রতি গোলাপগঞ্জের ৪১টি খামার পরিদর্শন করেছে জানিয়ে তিনি আরো বলেন, কোয়ারেন্টাল কন্ট্রোল অফিসার মনির হোসেনের নেতৃত্বে দলটি গোলাপগঞ্জের বিভিন্ন এলাকার গোয়ালগাদ্দা শিমের খামার পরিদর্শন করে সন্তুষ্টি প্রকাশ করেছে। গোলাপগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ কার্যালয়, রপ্তানিকারকসহ সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছে, আগামী সপ্তাহ থেকে গোয়ালগাদ্দা শিম বিদেশে রপ্তানি শুরু হবে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সিলেটের উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা সৈয়দ আব্দুস সবুর বলেন, সুস্বাদু হওয়ার কারণে গোয়ালগাদ্দা শিমের কদর দেশের বাইরেও রয়েছে। তা ছাড়া অন্য শিমের তুলনায় নরম হওয়ায় শিশুদেরও সহজে খাওয়ানো যায়। বাইরে রপ্তানি প্রসঙ্গে তিনি আরো বলেন, ‘আমরা সব ধরনের সহযোগিতা করে যাচ্ছি। তবে যারা রপ্তানির সঙ্গে জড়িত, তারা যদি খামারিদের সঙ্গে শুরু থেকে চুক্তিবদ্ধভাবে উৎপাদন প্রক্রিয়া তদারকি করে, তাহলে যথাযথ গুণগত মান ঠিক রেখে রপ্তানি করা যাবে। তাতে বাইরের দেশগুলোতেও এ শিমের চাহিদা আরো বাড়বে।

সূত্র- পদক্ষেপ