দেশি ট্যাংরার কৃত্রিম প্রজনন ও চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন

দেশি ট্যাংরার কৃত্রিম প্রজনন ও চাষ পদ্ধতি উদ্ভাবন

দেশি ট্যাংরা মাছের কৃত্রিম প্রজনন ও চাষের কৌশল উদ্ভাবন করেছেন মৎস্যবিজ্ঞানীরা। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সৈয়দপুর স্বাদু পানি উপকেন্দ্রের একদল বিজ্ঞানী এটি উদ্ভাবন করেন। গত জুনে এই প্রযুক্তি মৎস্য মন্ত্রণালয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে হস্তান্তর করা হয়েছে।

সৈয়দপুরে অনেক দিন থেকেই মৎস্যবিজ্ঞানীরা দেশি জাতের বিলুপ্তপ্রায় মাছ নিয়ে গবেষণা করছেন। তাঁরা এই প্রথম ট্যাংরা মাছের কৃত্রিম প্রজনন, পোনা উৎপাদন ও চাষের কলাকৌশল উদ্ভাবন করেছেন।

সৈয়দপুর-রংপুর মহাসড়কের পাশে সৈয়দপুরের কামারপুরে ২০০৩ সালে প্রায় ১০ একর জায়গা নিয়ে স্বাদু পানি উপকেন্দ্রটি প্রতিষ্ঠা করা হয়। মিঠা পানির বিলুপ্তপ্রায় ৫৪ প্রজাতির দেশি মাছ নিয়ে গবেষণা, উন্নত জাত উদ্ভাবন, চাষিদের উদ্বুদ্ধকরণ ও হাতে-কলমে শিক্ষা, পরামর্শসহ প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এখান থেকে। কাজ করছেন ৩ জন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তাসহ ১৭ জন কর্মচারী।

এখানে ১৫টি পুকুরে মাগুর, শিং, কই, রুই, কাতলা, জেনেটিক্যালি ইমপ্রুভড তেলাপিয়া, সরপুঁটি, ট্যাংরা, ভেদা, শোল, টাকি, খলিশা, গুতুমসহ নানা রকম মাছের জাত ও উন্নয়ন নিয়ে কাজ চলছে। সারা দেশে এ ধরনের উপকেন্দ্র রয়েছে পাঁচটি। এর মধ্যে সৈয়দপুর স্বাদু পানি উপকেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তারা বিপন্ন প্রজাতির ট্যাংরা মাছের প্রজনন ও পোনা উৎপাদনে সফলতা দেখিয়েছেন। ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা খোন্দকার রশীদুল হাসানের নেতৃত্বে বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মালিহা হোসেন ও শওকত আহম্মেদ এই পদ্ধতি উদ্ভাবন করেন। খোন্দকার রশীদুল হাসান জানান, ট্যাংরা মাছ খুবই সুস্বাদু ও পুষ্টিসমৃদ্ধ। কাঁটা কম থাকায় সবার প্রিয়। এপ্রিল থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত ট্যাংরা মাছের প্রজননকাল। এ সময় ৮-১০ গ্রাম ওজনের ট্যাংরা সংগ্রহ করে প্রস্তুতকৃত পুকুরে মজুত করে কৃত্রিম প্রজননের জন্য ব্রুড তৈরি করা হয়। হরমোন ইনজেকশন প্রয়োগের মাধ্যমে ডিম থেকে রেণু পোনা তৈরি করে ১০ দিনের মধ্যে পুকুরে ছাড়া হয়। রেণু পোনা ছাড়ার আগে পুকুর শুকিয়ে প্রথমে প্রতি শতাংশে এক কেজি হারে চুন প্রয়োগের পাঁচ দিন পর প্রতি শতাংশে ইউরিয়া ১০০ গ্রাম, টিএসপি ৭৫ গ্রাম ও গোবর চার কেজি ব্যবহার করা হয়। ব্রুড প্রতিপালন পুকুরের চারপাশে জালের বেষ্টনী দিয়ে ঘেরা দিতে হবে। সেই সঙ্গে নির্দেশিকামতো খাবার দেওয়া এবং যত্ন নিতে হয়। পুকুরে ছাড়া ট্যাংরা ৮-১০ মাসের মধ্যে খাওয়ার উপযোগী হয়ে ওঠে। এখানে গুতুম মাছের একটি উন্নত জাত উদ্ভাবনের কাজও প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে বলে তিনি জানান।

ট্যাংরা গবেষণা দলে থাকা বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মালিহা হোসেন বলেন, এই পদ্ধতিতে দ্রুত প্রজননের মাধ্যমে এই জনপ্রিয় মাছটি বিলুপ্তির কবল থেকে রক্ষা পাবে। আর অল্প সময়ে বৃদ্ধি পায় বলে চাষিরাও লাভবান হবেন।

বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ইয়াহিয়া মাহমুদের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করলে তিনি জানান, এই কেন্দ্রের উদ্ভাবিত ট্যাংরা মাছের কৃত্রিম প্রজনন, রেণু পোনা তৈরি ও লালনপালনের প্রযুক্তি মৎস্য মন্ত্রণালয়ে হস্তান্তর করা হয়েছে। ফার্ম ম্যানেজারদেরও প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। খুব তাড়াতাড়ি দেশি জাতের এই ট্যাংরা সারা দেশে ছড়িয়ে পড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। এতে মানুষ দেশি ট্যাংরা মাছের প্রকৃত স্বাদ পাবে।