হাঁসের খামার হতে পারে আপনারও

হাঁসের খামার হতে পারে আপনারও

 

ঢাকার বাইরে হাঁস পালন বেশ লাভজনক। তবে প্রশিক্ষণ না থাকলে ক্ষতির আশঙ্কা থাকে। দেশের বিভিন্ন জায়গায় রয়েছে হাঁস প্রজননকেন্দ্র। এখান থেকে প্রশিক্ষণ নিয়ে ব্যবসা হিসেবে দিতে পারেন খামার। বিস্তারিত জানাচ্ছেন সিদ্ধার্থ সাই

হাঁসের থাকার জন্য এমনভাবে ঘর বানাতে হবে যেন আলো-বাতাস যাওয়া-আসা করতে পারে। ঘরের আশপাশে জলাধার থাকলে ভালো হয়। ১০০টি হাঁস নিয়ে শুরু করতে পারেন আপনার হাঁসের খামার। ১০০টি হাঁসের খামার গড়তে ১৫টির বেশি হাঁসের বাচ্চা নিয়ে শুরু করতে হবে। প্রজননের জন্য হাঁসের খামারে ১০ : ১ পরিমাণে হাঁস এবং হাঁসা রাখতে হবে। বড় হলে প্রয়োজনীয় হাঁস ও হাঁসা রেখে অন্যগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। প্রথমে বাচ্চা এনে অন্তত সাত দিন সেগুলোকে নিয়ন্ত্রিত তাপমাত্রায় রাখতে হবে। এ জন্য শীতের সময় বেশি তাপ ক্ষমতাসম্পন্ন লাইট দিয়ে ঘরের তাপমাত্রা বাড়িয়ে রাখা জরুরি। গরমের দিনে ঘর ঠাণ্ডা রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। ঘরে হাঁসগুলো থাকার জায়গায় ধানের তুষ অথবা কাঠের গুঁড়া দিয়ে বিছানা তৈরি করতে হবে। ঘরের আশপাশ পরিষ্কার করাটাও জরুরি। কারণ অপরিষ্কার জায়গা থেকে রোগ-জীবাণু ছড়ানোর আশঙ্কা থাকে।

জাত নির্বাচন
হাঁসের বিভিন্ন জাত আছে। তবে খামারের জন্য জিনডিং ও দেশি_এ দুই ধরনের হাঁসই ভালো। এগুলো মাংস ও ডিম উৎপাদনে আমাদের আবহাওয়ার উপযোগী। জিনডিং হাঁস কষ্টসহিঞ্চু, এদের পালন পদ্ধতিও সহজ। এরা বছরে ২৫০ থেকে ২৭০টি ডিম দেয়। দেশি কালো জাতের হাঁস উচ্চ মাত্রায় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতাসম্পন্ন। এগুলো বছরে ২০০ থেকে ২৩০টি ডিম দেয়। এদের মাংসও খুব সুস্বাদু।
হাঁসের পালন পদ্ধতি ও খাবার
হাঁস পালনে তেমন শ্রম দিতে হয় না। বাইরে ছেড়ে দিলে নিজেরাই খাবার সংগ্রহ করতে পারে। অতিরিক্ত খাদ্য চাহিদা মেটাতে চালের কুঁড়ার সঙ্গে ডাবি্লউ এস-এ, ডি, ই, বি-১, বি-২, বি-৬, বি-১২ ভিটামিনগুলো দেওয়া যেতে পারে। পাঁচ মাস পর থেকে হাঁসগুলো ডিম দেওয়া শুরু করবে। তিন বছর বয়স পর্যন্ত হাঁস পূর্ণ মাত্রায় ডিম দেয়। এরপর হাঁসগুলোকে বাজারে বিক্রি করে দিতে হবে, যার মাংস খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হবে।

সাবধানতা
হাঁসের প্রধান রোগ কলেরা আর প্লেগ। হাঁসকে এসব রোগের মড়ক থেকে রক্ষা করতে কিছু নিয়ম পালন করতে হয়। ধানের তুষ দিয়ে বানানো হাঁসের বিছানায় প্রতিদিন বি্লচিং এবং ভিরকন-এস প্রয়োগ করতে হবে। কেউ ভেতরে যেতে চাইলে ভাইরাস মুক্তকারী দ্রবণে পা চুবিয়ে নেওয়ার পর তাকে যেতে দিতে হবে। ভয় পেলে হাঁসের ডিম পাড়ায় বিঘ্ন ঘটে। তাই সব সময় খেয়াল রাখতে হবে, হাঁসগুলো যেন কোনো ভাবেই ভয় না পায়। একদিন থেকে দুই মাস বয়সের মধ্যে দুবার প্লেগ ও কলেরার টিকা দিতে হবে। এরপর প্রতি ছয় মাস পরপর টিকা দিতে হবে। সরকারি দপ্তর থেকে টিকার ভ্যাকসিন কেনাই ভালো। ভ্যাকসিন কেনার সময় দেখে নিতে হবে সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা হয়েছে কি না। এরপর ক্রেতার কাছ থেকেই পরিবহনের সঠিক নিয়ম জেনে খামারে নিয়ে যেতে হবে। সঠিকভাবে পরিবহন না করলে ভ্যাকসিনের গুণাগুণ নষ্ট হয়ে যায়।

নিতে হবে প্রশিক্ষণ
নারায়ণগঞ্জে আছে বাংলাদেশ সরকারের কেন্দ্রীয় হাঁস প্রজননকেন্দ্র। এখান থেকে হাঁস পালনে প্রশিক্ষণ নিতে পারেন। খুলনার দৌলতপুরে, নওগাঁ, ফেনীর সোনাগাজী, কিশোরগঞ্জ ও রাঙামাটিতেও আছে প্রজননকেন্দ্র। আপনার কাছাকাছি কেন্দ্র থেকে সংগ্রহ করতে পারেন প্রয়োজনীয় হাঁসের বাচ্চা। হাঁসের খাবার ও ওষুধপত্র কিনতে পাওয়া যাবে প্রায় প্রতিটি বিভাগীয় শহরেই। ঢাকার ফুলবাড়িয়ায় আছে পাখির খাদ্যের বৃহৎ বাজার। চালের মিল থেকে তুষ ও কুঁড়া সংগ্রহ করা যাবে। এ ছাড়া পশুখাদ্য দোকানেও তুষ ও কুঁড়া পাওয়া যায়। কীটনাশকের দোকানে ভিরকন এস এবং মুদি দোকান থেকে বি্লচিং পাউডার সংগ্রহ করা যাবে।

প্রয়োজনীয় পুঁজি
প্রাথমিকভাবে লাভের জন্য তিন বছরের পরিকল্পনা নিয়ে খামার গড়তে হবে। ১০০টা হাঁসের জন্য বাঁশের একটি ঘর বানাতে এককালীন খরচ পড়বে ১৫ হাজার টাকা। ১১৫টি হাঁসের বাচ্চার দাম পড়বে এক হাজার ৩৮০ টাকা। কুঁড়াপ্রতি বস্তা পড়বে ২০০ টাকা, মাসে এক বস্তা করে কুঁড়া লাগবে। বছরে ১২ বস্তা, তিন বছরে ৩৬ বস্তা। ৩৬ বস্তা কুঁড়ার দাম পড়বে সাত হাজার ২০০ টাকা। বি্লচিং পাউডার লাগবে মাসে পাঁচ কেজি। দাম কেজিপ্রতি ৬০ টাকা হলে ৩৬ মাসে বি্লচিং পাউডার লাগবে ১৮০ কেজি, যার দাম পড়বে ১০ হাজার ৮০০ টাকা। তুষ বা কাঠের গুঁড়া লাগবে চার মাস অন্তর চার বস্তা করে। এক বস্তা কাঠের গুঁড়ার দাম ৫০ টাকা। বছরে লাগবে ১২ বস্তা। তিন বছরে ৩৬ বস্তা কাঠের গুঁড়ার দাম পড়বে এক হাজার ৮০০ টাকা। ভ্যাকসিন লাগবে বছরে এক হাজার টাকা করে তিন বছরে তিন হাজার টাকার। আপৎকালীন সময়ের জন্য হয়তো লাগবে আরো ১০ হাজার ৮২০ টাকা। মোট খরচ তিন বছরে ৫০ হাজার টাকা।

লাভ কেমন
বছরে হাঁস ডিম দেয় গড়ে ২৩০টি। ১০০টি হাঁসের ৯০টি হাঁস ডিম দিলে বছরে ডিম পাওয়া যাবে ২০ হাজার ৭০০টি। ৩০ টাকা হালি ধরে ২০ হাজার ৭০০টি ডিমের দাম এক লাখ ৫৫ হাজার ২৫০ টাকা। একটি হাঁস গড়ে দুই-তিন কেজি হয়।
তিন বছর ডিম দেওয়ার পর একেকটা হাঁস গড়ে ২০০ টাকা হিসাবে ১০০টি হাঁস বিক্রি করে পাওয়া যাবে ২০ হাজার টাকা। খরচ বাদ দিয়ে এক বছরে নিট লাভ ৫৮ হাজার ৪০০ টাকা।

 

Top
%d bloggers like this: