বেগুন চাষ

begun

বেগুন যথেষ্ট পুষ্টি সমৃদ্ধ, অধিক ফলা ও লাভজনক। আমাদের দেশে তরকারি হিসাবে খাওয়া ছাড়াও ভাজি, সিদ্ধ/আগুনে পুড়িয়ে ভর্তা হিসাবে খাওয়া হয়। বেগুনের আচার খুবই জনপ্রিয়।

পুষ্টিমান
আমাদের দৈনন্দিন চাহিদার প্রায় সব কয়টি পুষ্টিমান বেগুনে কমবেশী বিদ্যমান।

মাটি
হালকা বেলে থেকে ভারী এটেল মাটি অর্থাৎ প্রায় সব ধরনের মাটিতেই বেগুনের চাষ করা হয়। এটেঁল দো-আঁশ ও পলি দো-আঁশ মাটি বেগুন চাষের জন্য উপযোগী এবং এই মাটিতে বেগুনের ফলন বেশী হয়।

বেগুনের জাত
বাংলাদেশে প্রধানতঃ লম্বা ফল, গোলাকর ফল ও গোলাকার এই তিন ধরণের বেগুনের চাষ বেশী হয়ে থাকে। সব জাতকে মৌসুম ভিত্তিক দুই ভাবে ভাগ করা যেতে পারে, যেমন-শীতকালীন বেগুন ও বারমাসী বেগুন। শীতকালীন জাতের বেগুন রবি মৌসুমে চাষ করা হয় কারণ, এই জাতের বেগুন কেবলমাত্র রবি মৌসুমেই ফল দিতে পারে। আর বারমাসী বেগুন বছরের যে কোন সময় চাষ করা যেতে পারে। বেগুনের উল্লেখযোগ্য কিছু জাত হলো- ইসলামপুরী, খটখটিয়া, লাফফা, ঈশ্বরদি-১, উত্তরা (বারি বেগুন ১), তাল বেগুন, নয়ন কাজল, কেজি বেগুন, শিংনাথ, ঝুমকো, তারাপুরী (বারি বেগুন ২), কাজলা (বারি বেগুন ৪), নয়নতারা (বারি বেগুন ৫), চমক এফ১, কাজল এফ১ ইত্যাদি। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে বিটি বেগুন-১, ২, ৩, ৪ জাত নামের চারটি জাত উদ্ভাবন করা হয়েছে যেগুলো বেগুনের মারাত্মক ক্ষতিকর ফল ছিদ্রকারী পোকার আক্রমণ প্রতিরোধী।

চাষের মৌসুম
বাংলাদেশের জলবায়ুতে বছরের যে কোন সময়ই বেগুনের চাষ করা যেতে পারে। তবে রবি মৌসুমে বেগুন চাষ করলে ফলন খরিপ মৌসুমের চেয়ে পাওয়া যায়। রবি মৌসুম অর্থাৎ শীতকালের জন্য সাধারণতঃ আগষ্ট থেকে অক্টোবর পর্যন্ত বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। খরিপ মৌসুম অর্থাৎ বর্ষাকালীন বেগুনের জন্য জানুয়ারি থেকে মে মাস পর্যন্ত বীজ বোনার উপযুক্ত সময়। রবি মৌসুমে চাষের জন্য যে কোন জাতের বেগুন লাগানো যেতে পারে, কিন্তু খরিপ মৌসুমে চাষের জন্য বারমাসী জাতসমূহ লাগাতে হবে।

বীজ ও বীজ শোধন
বীজ শোধন করে বেগুন চাষ করলে বেশ কয়েকটি রোগের হাত থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। প্রতি কেজি বীজের জন্য ২.৫ গ্রাম ভিটাভেক্স-২ নামক ছত্রাকনাশক ও বীজ পাত্রে ঢেলে এমনভাবে ঝাকাতে হবে যেন বীজের গায়ে ছত্রাক নাশক ভালভাবে লেগে যায়। শোধনকৃত বীজ পাত্র থেকে বের করার পর ছায়াতে শুকিয়ে নিতে হবে। বীজ বপনের ছয় ঘন্টা আগে বীজশোধন করা ভাল।

চারা তৈরি
বেগুন চাষের জন্য প্রথমে বীজতলায় চারা করে তা মূল জমিতে রোপণ করতে হয়। বীজতলা এমন স্থানে তৈরী করতে হবে যেখানে বৃষ্টির পানি দাঁড়াবে না অর্থাৎ সুনিষ্কাশিত হতে হবে, সর্বদা আলো-বাতাস পায় অর্থাৎ ছায়ামুক্ত হতে হবে।
চাষের পর সম্পূর্ণ জমিকে কয়েকটি ছোট ছোট বীজতলাতে ভাগ করে নিতে হবে। প্রতিটি বীজতলা দৈর্ঘ্যে ৩-৫ ঘন মিটার, প্রস্থে এক মিটার ও পাশ থেকে ১৫ সেন্টিমিটার ফাঁকা জায়গা রাখা উচিত। পাশাপাশি দুটো বীজতলার মধ্যে ৫০-৬০ সেন্টিমিটার ফাঁকা জায়গা রাখা উচিত। এ ফাঁকা জায়গা থেকে মাটি নিয়ে বীজতলা উঁচু করে নিতে হবে। অল্প সংখ্যক চারা উৎপাদনের জন্য বীজতলা হিসেবে কাঠের বাক্স, প্লাস্টিকের ট্রে অথবা বড় টব ব্যবহার করা যেতে পারে।
প্রতি হেক্টর জমিতে বেগুন চাষের জন্য ২৫০-৩০০ গ্রাম বীজের প্রয়োজন হয়।
বীজতলাতে বীজ ছিটিয়ে বা সারি করে বোনা যেতে পারে। সারিতে বুনলে সারি থেকে সারির দূরত্ব ৫ সেমি. দিতে হবে। বীজ বোনার পর বীজতলার মাটি হালকা করে চেপে দিতে হবে। বীজতলাতে চারার দূরত্ব ২-৩ সেমি. হলে চারার বৃদ্ধি ভাল হয়। বীজ বোনার পর ঝাঝরি দিয়ে হালকা ভাবে পানি ছিটিয়ে সেচ দেওয়া দরকার। প্রয়োজন হলে, শুকনা খড় বা পলিথিন শীট বা বস্তা দিয়ে বীজতলা ঢেকে দেওয়া যেতে পারে। গ্রীষ্মকালে সকালে ও সন্ধ্যায় হালকাভাবে সেচ দেওয়া প্রয়োজন। চারা গজানোর পর ২-৩ দিন অন্তর হালকা সেচ দেওয়া উচিত।

জমি তৈরি ও চারা রোপণ
সাধারণতঃ মাঠের জমি তৈরির জন্য ৪-৫ বার চাষ ও মই দিয়ে মাটি ঝুরঝুরে করে নিতে হবে। ৩৫-৪৫ দিন বয়সের চারা রোপণের উপযোগী হয়। এ সময় চারাতে ৫-৬টি পাতা গজায় এবং চারা প্রায় ১৫ সেমি. লম্বা হয়। চারা তোলার সময় যাতে শিকড় নষ্ট না হয় সেজন্য চারা তোলার ১-২ ঘন্টা আগে বীজতলায় পানি দিয়ে মাটি ভিজিয়ে নিতে হবে। সাধারণতঃ বড় আকারের বেগুনের জাতের ক্ষেত্রে ৯০ সেমি. দূরে সারি করে সারিতে ৬০ সেমি. ব্যবধানে চারা লাগানো যেতে পারে এবং ক্ষুদ্রাকার জাতের ক্ষেত্রে ৭৫ সেমি. সারি করে সারিতে ৫০ সেমি. ব্যবধানে চারা লাগানো যেতে পারে। জমিতে লাগানোর পর পরই যাতে চারা শুকিয়ে না যায় সে জন্য সম্ভব হলে বিকালের দিকে চারা লাগানো উচিত।

সার প্রয়োগ
মাটি পরীক্ষা করে জমি ও ফসলের চাহিদা অনুযায়ী সার দেয়া ভালো। তবে সাধারণ হারে বেগুনের জমিতে সারের পরিমান নিম্নরুপ:

সেচ প্রয়োগ
বেগুন চাষের জন্য সেচ অত্যন্ত প্রয়োজন বেগুনের শিকড় মাটির খুব গভীরে যায় না বলে ভাল উৎপাদন পাওয়ার জন্য ঘন ঘন সেচ দিতে হবে।

পোকামাকড় ব্যবস্থাপনা
বেগুনের সবচেয়ে ক্ষতিকর পোকা হল বেগুনের ডগা ও ফল ছিদ্রকারী পোকা। কোন কোন এলাকায় ক্ষুদ্র লাল মাকড় প্রধান শত্রু। এছাড়া কাঁটালে পোকা বা ইপলাকনা বিট্ল, জাব পোকা, ছাতরা পোকা, বিছা পোকা, পাতা মোড়ানো পোকা, থ্রিপস, কাটুই পোকা ইত্যাদি বেগুনের ক্ষতি করে থাকে। আইপিএম পদ্ধতিতে এসব পোকা নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নিতে হবে।

বেগুনের ডগা ও ফলছিদ্রকারী পোকা
কীড়া কুঁড়ি, পাতার বোঁটা, কচি ডগা ইত্যাদি ছিদ্র করে খেতে খেতে ভিতরে ঢোকে। ভিতরে ঢুকে ক্রমাগত খাওয়ার ফলে সুড়ঙ্গের সৃষ্টি হয়। ফলে কচি ডগা ঢলে পড়ে এবং অবশেষে মারা যায়। একইভাবে ফল ছিদ্র করে ভিতরে ঢোকে ও শাঁস খায়। আক্রান্ত ফলের গায়ে কীড়ার মলসহ ছিদ্র দেখা যায়। আক্রান্ত বেগুন কাটলে ভিতরে মল ও পচা সুড়ঙ্গ দেখা যায়। কীড়াও দেখা যেতে পারে। বেশি আক্রান্ত হলে ফল খাওয়ার অযোগ্য হয়ে পড়ে এবং বাজারে আক্রান্ত বেগুনের চাহিদাও থাকে না।

 দমন ব্যবস্থাপনা
১.    শক্ত খোসাযুক্ত ও লম্বা জাতের বেগুনে যেমন ঝুমকা, শিংনাথ  ইত্যাদিতে এ পোকার আক্রমণ তুলনামূলকভাবে কম হয়। এছাড়া উত্তরা, নয়নতারা প্রভৃতি জাত সহনশীল। সম্প্রতি বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট থেকে উদ্ভাবিত বিটি বেগুন -১, ২, ৩, ৪ জাতে এ পোকার আক্রমণ হয় না। এসব জাত চাষ করা যেতে পারে।
২.    প্রতি সপ্তাহে অন্ততঃ একবার আক্রান্ত ডগা ও ফল ছিঁড়ে ধ্বংস করতে হবে।
৩.    ক্ষেত সবসময় পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। আগাছা, বেগুনের মরা পাতা, আক্রান্ত ডগা ইত্যাদি সরিয়ে ফেলতে হবে।
৪.    ক্ষেতে সুষম সার ব্যবহার করতে হবে।
৫.    ডিম ও কীড়ামুক্ত চারা রোপণ করতে হবে।
৬.    ফেরোমোন ফাঁদ ব্যবহার করে পুরুষ মথ ধরে এদের বংশ কমানো যায়।

রোগ ব্যবস্থাপনা
এ দেশে বেগুনের ঢলে পড়া ও গোড়া পচা দু’টি মারাত্মক রোগ। প্রায় বেগুন ক্ষেতেই এ রোগ দেখা যায়। ফল পচা রোগেও অনেক বেগুন নষ্ট হয়। বীজতলায় ড্যাম্পিং অফ রোগ চারার মড়ক সৃষ্টি করে। এ ছাড়া মোজাইক, ক্ষুদে পাতা, শিকড়ে গিঁট ইত্যাদি রোগও বেগুন ফসলের যথেষ্ট ক্ষতি করে থাকে।
বেগুনের ঢলে পড়া রোগ

রোগের লক্ষণ
যে কোন বয়সের গাছই ক্ষেতে গেলে অনেক সময় ঝিমিয়ে ঢলে যেতে দেখা যায়। । এ রোগের প্রকোপ বেশি হলে সম্পূর্ণ ক্ষেতই নষ্ট হয়ে যেতে পারে। এ রোগে আক্রান্ত  হয়ে গাছের কচি পাতা প্রথমে ঢলে পড়ে কিংবা নীচের বয়স্ক পাতা বিবর্ণ হয়ে যায়। শিকড়ের মাধ্যমে আক্রমণ শুরু হলেও পরে তা কান্ডে ছড়িয়ে পড়ে। ব্যাকটেরিয়া এবং ছত্রাক জীবাণু দ্বারা এ রোগ হয়ে থাকে। ব্যাকটেরিয়া দ্বারা আক্রান্ত  হলে গাছ হঠাৎ ঢলে পড়ে। আক্রান্ত  গাছের ডাল কেটে পানিতে রাখলে ব্যাকটেরিয়ার সাদা কষের মত তরল বেরিয়ে আসে। পক্ষান্তরে ছত্রাক জীবাণু দ্বারা গাছ আক্রান্ত  হলে প্রথমে গাছের অংশ বিশেষ এবং কয়েকদিন পর সম্পূর্ণ গাছ ঢলে পড়ে। আক্রান্ত  কান্ডের ভিতরের অংশ বাদামী রং ধারণ করে। গরম ও আর্দ্র আবহাওয়ায় মাটি যদি ভেজা থাকে তাহলে এ রোগের তীব্রতা বৃদ্ধি পায়।
দমন ব্যবস্থাপনা
১.    রোগ মুক্ত চারা উৎপাদন ও রোপণ করতে হবে। বীজ তলায় বীজ বপনের ২-৩ সপ্তাহ পূর্বে ৩-৫ টন/হেক্টর হারে মুরগির পচা বিষ্ঠা মাটির সাথে মিশিয়ে দেয়া। মূল জমিতেও এভাবে মুরগির বিষ্ঠা  দেয়া যেতে পারে। ২৫০-৩০০ কেজি/হে: হারে সরিষা বা নিম খৈল এভাবে প্রয়োগ করেও সুফল পাওয়া যায়।
২.    জমি আগাছামুক্ত রাখা। ঢলে পড়া চারা ক্ষেতে দেখা মাত্রই তুলে তা ধ্বংস করতে হবে।
৩.    পর্যাপ্ত পরিমাণে জৈব সার ও পরিমিত ইউরিয়া ব্যবহার করা।
৪.    জমি সব সময় আর্দ্র বা ভিজা না রাখা এবং নিকাশের ব্যবস্থা রাখা।
৫.    বন বেগুন গাছের কান্ডের সাথে কাঙ্খিত জাতের জোড় কলম করে বেগুনের চাষ করলে ঢলে পড়া রোগ সম্পূর্ণ প্রতিরোধ করা যায়।

আগাছা দমন
আগাছা খাদ্য, পানি ও আলোর জন্য ফসলের সাথে প্রতিযোগিতা করে এবং পোকা মাকড় ও রোগজীবাণুর আশ্রয়স্থল হিসাবে কাজ করে। সে জন্য জমিতে আগাছা দেখা দিলে মাঝে মাঝে পরিস্কার করে মাটি আলগা করে দিতে হবে। হালকাভাবে মাটি আলগা করে নির্দিষ্ট দিন পর পর নিড়ানি দেওয়া যেতে পারে এতে করে গাছের শিকড় বৃদ্ধি ভাল হবে।

ফল সংগ্রহ ও ফলন
ফল সম্পূর্ণ পরিপক্ক হওয়ার পূর্বেই সংগ্রহ করতে হবে। বেশী কচি অবস্থায় ফল সিকি ভাগ সংগ্রহ করলে ফলের গুণ ভাল থাকে, তবে ফলন কম পাওয়া যায়। ফলের বৃদ্ধি থেকে শুরু করে পরিপক্ক পর্যায়ের কাছাকাছি পৌঁছানো পর্যন্ত বেগুন খাওয়ার উপযুক্ত থাকে। সাধারণতঃ ফুল ফোটার পর ফল পেতে গড়ে প্রায় ১ মাস সময় লাগে। জাত ভেদে হেক্টর প্রতি ১৭-৬৪ টন ফলন পাওয়া যায়।

সংগৃহীত ও সংকলিত

Top