থোকা থোকা মাল্টা

মাল্টা

 

ছোট ছোট গাছে ঝুলছে থোকা থোকা মাল্টা। একেকটি গাছে ১৫-২০টি থেকে ৪০টি পর্যন্ত। গাঢ় সবুজ রঙের মাল্টাগুলোর কোনো কোনোটিতে হলুদাভ ভাব এসেছে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ সদর উপজেলার জামতাড়া এলাকায় দুই বছর বয়সী এই মাল্টা বাগানের মালিক মতিউর রহমান।
প্রায় আট বছর আগে ১০ বিঘা জমি লিজ নিয়ে মতিউর বাণিজ্যিকভাবে পেয়ারা, আম, লেবু, কুল ও বেদানার চাষ শুরু করেন। কিছুদিন পর স্থানীয় একটি জাতের মাল্টার বেশ কিছু চারা রোপণ করেন। দেড় বছরের মাথায় সেগুলোতে ফল ধরে। কিন্তু ফলগুলো ছিল পানসে। মাল্টা চাষের কথা তখনই মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলেন মতিউর। অন্য ফলগুলোর আবাদ ভালোই চলতে থাকে।
বছর দুয়েক আগে স্থানীয় হর্টিকালচার সেন্টারের কর্মকর্তারা মতিউর রহমানকে বারি মাল্টা-১-এর কিছু চারা নিয়ে পরীক্ষামূলকভাবে রোপণ করার প্রস্তাব দেন। প্রস্তাবে সাড়া দিয়ে ২০০ চারা এনে দুই বিঘা জমিতে রোপণ করেন তিনি। এরপর শুরু হয় সেগুলোর যত্ন। অপেক্ষায় থাকেন ফল পাওয়ার। অবশেষে তিন মাস আগে বাগানের তিন-চতুর্থাংশ গাছে ধরে কাঙ্ক্ষিত ফল। সবুজ সেই মাল্টায় জীবনে নতুন করে আলোর দিশা দেখতে পান মতিউর রহমান।
এই প্রতিবেদক সম্প্রতি মতিউরের মাল্টার বাগান দেখতে গিয়েছিলেন। গাছে গাছে ঝুলছে পরিপক্ব মাল্টা। ফল সবুজ হলেও ভীষণ রসাল ও মিষ্টি লাগল খেতে। মতিউর রহমান বলেন, বাগানটি কৃষি বিভাগের দ্বিতীয় শস্য বহুমুখীকরণ প্রকল্পের (এসসিডিপি) আওতায়। প্রথমবারের ফলন সুস্বাদু হওয়ায় দারুণ খুশি কৃষি বিভাগের কর্মকর্তারা। এ মাসের (সেপ্টেম্বর) শেষের দিকে বাগান থেকে মাল্টাগুলো তোলা হবে।
মতিউর রহমান বলেন, এসসিডিপির সাবেক প্রকল্প পরিচালক এবং বর্তমানে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হামিদুর রহমান সম্প্রতি এই বাগান পরিদর্শন করে গেছেন। কৃষি বিভাগের স্থানীয় কর্মকর্তারা এবারের ফলনের সব মাল্টাই কিনে নিতে চেয়েছেন।
এসসিডিপি প্রকল্পের উদ্যান প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা কৃষিবিদ জহুরুল ইসলাম বলেন, মাল্টা চাষের সম্ভাবনা যাচাই করার জন্য এই বাগানের মাল্টার নমুনা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে পাঠানো হবে। উল্লেখ্য, এই কর্মকর্তার তদারকিতেই প্রথমবারের মতো পরীক্ষামূলকভাবে বরেন্দ্র অঞ্চলে বারি মাল্টা-১-এর চাষ শুরু হয়েছে।

গাছে ঝুলছে থোকা থোকা মাল্টা

  

চাঁপাইনবাবগঞ্জ হর্টিকালচার সেন্টারের উপপরিচালক সাইফুর রহমান জানান, সড়কের পাশ দিয়ে দিয়ে যাওয়ার সময় মতিউর রহমানের এই মাল্টার বাগান অনেকেরই দৃষ্টি কাড়ে। বারি মাল্টা-১ চাষের সাফল্য দেখে অনেকেই এখন এই ফল চাষে আগ্রহ দেখাচ্ছেন। চারা সংগ্রহের জন্য কেউ কেউ হর্টিকালচার সেন্টারে আসছেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক হামিদুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, শীতকালে লেবুজাতীয় দেশি ফল থাকে না বললেই চলে। সে ক্ষেত্রে বারি মাল্টা-১ লেবুজাতীয় ফলের উৎপাদনের ক্ষেত্রে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনবে বলে আশা করা যায়। এর বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে। কেননা বারি মাল্টা-১ দারুণ সুস্বাদু একটি ফল।
মাল্টা চাষের পদ্ধতি: এসসিডিপি প্রকল্পের উদ্যান প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা জহুরুল ইসলাম বলেন, সারা দিন রোদ পড়ে এবং বৃষ্টির পানি জমে না—এমন উঁচু বা মাঝারি উঁচু জমি মাল্টা চাষের জন্য নির্বাচন করতে হবে। নির্বাচিত জমিটি কয়েকবার চাষ ও মই দিয়ে সমান করে নিতে হবে। জমি থেকে আগাছা পরিষ্কার করে আশপাশে উঁচু গাছ থাকলে কেটে ফেলতে হবে। সমতল ভূমিতে বর্গাকার বা ষড়ভূজি পদ্ধতিতে চারা রোপণ করতে হবে। সাধারণত মধ্য বৈশাখ থেকে মধ্য ভাদ্র (মে-আগস্ট) মাসের মধ্যে মাল্টার চারা রোপণের উপযুক্ত সময়। তবে পানির সেচ নিশ্চিত করা গেলে চারা বছরের যেকোনো সময় লাগানো যেতে পারে।
চারা রোপণের জন্য গর্তের আকার ৭৫ সেন্টিমিটার বাই ৭৫ সেন্টিমিটার হবে। একটি চারা থেকে অন্যটির দূরত্ব হবে চার মিটার। তবে তিন মিটার দূরত্বেও চারা লাগানো যেতে পারে। গর্তের মধ্যে ১৫ কেজি গোবর বা কম্পোস্ট সার দিয়ে তিন থেকে পাঁচ কেজি ছাই, ২৫০ গ্রাম টিএসপি, ২৫০ গ্রাম এমওপি সার ও ২৫০ গ্রাম চুন ওপরের মাটির সঙ্গে মেশাতে হবে। গর্তগুলো ১৫-২০ দিন ভরাট করে রেখে তারপর চারা লাগাতে হবে।

Top
%d bloggers like this: