থাই পেয়ারার চাষ

      No Comments on থাই পেয়ারার চাষ

থাই পেয়ারার চাষ

এও সি ভিটামিন সমৃদ্ধ বহুবিধ গুণের জন্য নিরক্ষীয় অঞ্চলে পেয়ারাকে বলা হয় আপেল। বাংলাদেশের সর্বত্র কম-বেশি পেয়ারার চাষ হয়। বাংলাদেশে বর্তমানে ২৪ হাজার ৫১৫ হেক্টর জমি থেকে ৪৫ হাজার ৯৯০ মেট্রিক টন পেয়ারা উৎপন্ন হয়। ক’বছর আগেও শীতকালে পেয়ারা পাওয়া যেত না। দেশের কৃষিবিজ্ঞানীদের গবেষণা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের ফলে এখন শীতকালেও সুস্বাদু পেয়ারা পাওয়া যাচ্ছে দেশে। থাইল্যান্ড থেকে আসা থাই পেয়ারা-৫ ও থাই পেয়ারা-৭ এখন চাষ হচ্ছে সারা দেশে। বেশি ফলন ও বেশি দামের জন্য এ পেয়ারা এরই মধ্যে দেশের ফলচাষিদের মধ্যে বিপুল সাড়া জাগাতে সক্ষম হয়েছে। রাজশাহী, নাটোর, বগুড়া ও ঈশ্বরদীর অনেক ফলচাষি থাই পেয়ারা চাষ করে তাদের আর্থিক অবস্থার পরিবর্তন করতে সক্ষম হয়েছেন এবং অধিক লাভ হওয়ার কারণে এর চাষ সারা দেশে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। পেয়ারার এসব জাতের মধ্যে সবচেয়ে উৎকৃষ্ট জাতটি হলো থাই পেয়ারা-৭। এ পেয়ারার আকার গোলাকার, রঙ হলদে সবুজ, প্রতিটি পেয়ারার ওজন গড়ে ৪০০ থেকে ৭০০ গ্রাম। গাছের উচ্চতা ২.৫ থেকে ১০ মিটার। ফুল ফোটা থেকে ফসল সংগ্রহ পর্যন্ত ৯০ দিন সময় লাগে। এ জাতের বড় বৈশিষ্ট্য হলো- বারো মাসই এ পেয়ার পাওয়া যায়। বীজ কম ও নরম। অন্যান্য পেয়ারার চেয়ে বেশি মিষ্টি ও কচকচা। বসতবাড়ির আঙিনায়, বাড়ির ছাদে বা মাঠে বাণিজ্যিকভাবে বেশ লাভজনকভাবে এ পেয়ারা চাষ করা যায়।

এ জাতের পেয়ারা বর্তমানে রাজধানী ঢাকা শহরে ১২০ থেকে ১৫০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। অপার সম্ভাবনাময় এ পেয়ারা পরীক্ষামূলকভাবে এক বিঘা জমিতে চাষ করে খরচ বাদে ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত লাভ পাওয়া গেছে। এ কারণে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান প্রকল্প গত বছর ৩ লাখ থাই পেয়ারার চারা উৎপাদন করে। প্রতিটি চারা মাত্র ১০ টাকা মূল্যে বিক্রি করা হয়। সমন্বিত মানসম্পন্ন উদ্যান প্রকল্পের পরিচালক বলেন, ২০০২ সালে থাইল্যান্ড থেকে বাংলাদেশে প্রথমবারের মতো উন্নত জাতের পেয়ারার জাত আনা হয়। তারপর ২০০৪ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত আরও কয়েকটি জাত এনে দেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়। সর্বশেষ থাই পেয়ারা-৭ জাতটির মধ্যে উৎকর্ষতা পাওয়া যায়। জাতটি দেশের মাটি ও আবহাওয়া উপযোগী। দেশের বিভিন্ন জেলায় সরকারি হার্টিকালচার সেন্টার, ব্র্যাক নার্সারি এবং বিভিন্ন বেসরকারি নার্সারি যেমন বগুড়ার সবুজ নার্সারি ও নাটোরের তেকুপির কৃষিবিদ নার্সারিতে সুলভে থাই পেয়ারার চারা পাওয়া যায়। দেশের বিভিন্ন জায়গায় বেশ কিছুসংখ্যক প্রগতিশীল ফলচাষি থাই পেয়ারা চাষ করে সফল হয়েছেন।

শার্শা উপজেলার বাহাদুরপুর গ্রামের রায়হান উদ্দিন পেয়ারা বিক্রি করে ১৯ লাখ টাকা লাভ করেছেন। তিনি ৩৪ বিঘা জমিতে থাই পেয়ারা চাষ করেন। এতে খরচ পড়ে ১ লাখ টাকা। পরবর্তীতে তিনি প্রতি কেজি পেয়ারা বিক্রি করেছেন সর্বোচ্চ ১৭৫ টাকা। বিঘাপ্রতি ফলন হয়েছে ২ হাজার কেজি। উদ্যান বিশেষজ্ঞরা জানান, এক বিঘা জমিতে পূর্ণবয়স্ক গাছ থাকলে ২ হাজার কেজির বেশি পেয়ারা উৎপন্ন হয়। সব খরচ বাদে চাষির লাভ থাকে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা। নাটোর শহরের আলম নামের একজন ফলচাষি ২৫ বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলেছেন থাই পেয়ারার এক নয়নকাড়া বাগান। তিনি গ্রীষ্ম ও বর্ষার সময় তেমন বেশি ফল নেন না। কারণ এ সময় পেয়ারার দাম কম থাকে। তিনি এ সময়ে ধরা ফলের শতকরা প্রায় ৮০ ভাগ নষ্ট করে দেন। এতে শরৎ ও শীতকালে প্রচুর ফল ধরে। অমৌসুমে পেয়ারার দাম বেশি থাকায় লাভের পরিমাণটাও বেশি হয়।
চাষ পদ্ধতি : অন্যান্য জাতের পেয়ারার মতোই মধ্য জ্যৈষ্ঠ থেকে মধ্য আশ্বিন মাসে থাই পেয়ারা-৭ এর চারা রোপণ করতে হয়। এ পেয়ারা চাষের জন্য নিকাশযুক্ত বেলে দো-অাঁশ মাটিই উত্তম। এ পেয়ারার বংশবৃদ্ধির জন্য বীজ থেকে চারা বা গুটি কলম ব্যবহার করা উচিত। চার বাই চার বা তিন বাই তিন মিটার দূরত্বে এ জাতের পেয়ারার চারা রোপণ করা যায়। রোপণের কয়েক সপ্তাহ আগে ৫০ সেন্টিমিটার দৈর্ঘ্য, ৫০ সেন্টিমিটার প্রস্থ ও ৫০ সেন্টিমিটার চওড়া গর্ত খনন করতে হবে। প্রতিটি গর্তে মাটির সঙ্গে চারা রোপণের ২০ থেকে ৩০ দিন আগে ৪০ থেকে ৫০ কেজি পচা গোবর সার, ১৫০ গ্রাম টিএসপি ও ১৫০ গ্রাম এমওপি সার মিশিয়ে দিতে হবে। তার পর সারমিশ্রিত মাটি দ্বারা গর্ত ভরাট করে গর্তের মাঝখানে চারাটি রোপণ করতে হবে। চারা রোপণের পর গর্তের চারদিকে মাটি দ্বারা উঁচু করে বেঁধে দিতে হবে, যাতে বাইরের পানি এসে গাছের গোড়ায় না জমে।

গাছটি যাতে বাতাসে হেলে না পড়ে সেজন্য বাঁশের খুঁটির সঙ্গে হালকাভাবে বেঁধে দিতে হবে। রসের অভাব হলে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে। পেয়ারা গাছ থেকে অধিক ফলন পেতে পাঁচ বছরের নিচের একটি গাছে বছরে পচা গোবর ২০ থেকে ২৫ কেজি, ইউরিয়া ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম, টিএসটি ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম ও এমওপি ৩০০ থেকে ৪০০ গ্রাম এবং পাঁচ বছরের ওপর একটি গাছে প্রতি বছর পচা গোবর ২৫ থেকে ৩০ কেজি, ইউরিয়া ৫০০ থেকে ৭০০ গ্রাম, টিএসপি ৪৫০ থেকে ৫৫০ গ্রাম, এমওপি ৪৫০ থেকে ৫৫০ গ্রাম সার ব্যবহার করতে হবে। উল্লিখিত পরিমাণ সার সমান দুইভাগে ভাগ করে বছরের ফেব্রুয়ারি-মার্চ এবং আগস্ট-সেপ্টেম্বর মাসে দুই কিস্তিতে প্রয়োগ করতে হবে। সার প্রয়োগের পর প্রয়োজনে সেচ দিতে হবে। অনেক সময় জিঙ্কের অভাবে পাতার শিরায় ক্লোরোসিস দেখা যায়। সেক্ষেত্রে ৮০ লিটার পানিতে ৪০০ গ্রাম জিঙ্ক ও ৪০০ গ্রাম চুন মিশিয়ে গাছে স্প্রে করতে হবে। পেয়ারা সংগ্রহের পর ভাঙা, রোগাক্রান্ত ও মরা শাখা-প্রশাখা ছাঁটাই করে ফেলতে হবে। পেয়ারা গাছ প্রতি বছর প্রচুরসংখ্যক ফল দিয়ে থাকে। গাছের পক্ষে সব ফল ধারণ সম্ভব হয় না। তাই মার্বেল আকৃতির হলেই ঘন সন্নিবিষ্ট ফল ছাঁটাই করতে হবে। ছাতরা পোকা, সাদা মাছি পোকা, ফল ছিদ্রকারী পোকা ও মাছি পোকাসহ বিভিন্ন রকমের পোকা দ্বারা পেয়ারার গাছ আক্রান্ত হয়। এসব পোকা-মাকড় দমনের জন্য সমন্বিত বালাই দমন ব্যবস্থাপনা অনুসরণ করতে হবে। যেমন-মাটিতে পড়ে থাকা পোকা আক্রান্ত ফল কুড়িয়ে ধ্বংস করা। ফেরোমোন ফাঁদ ও বিষ টোপ ব্যবহার।
সাদা মাছি দমনের জন্য প্রতি লিটার পানিতে পাঁচ গ্রাম ডিটারজেন্ট পাউডার মিশিয়ে গাছে স্প্রে করা। আর অন্যান্য পোকা দমনের জন্য পেয়ারা গাছে ১০ থেকে ১৫ দিন পর পর দুই থেকে তিনবার সিমবুশ বা মেলাথিয়ন ইত্যাদি কীটনাশকের যে কোনো একটি প্রতি ১০ লিটার পানিতে ২৫ মিলি মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে। এছাড়া পেয়ারা গাছে অ্যানথ্রাকনোজ রোগ দেখা দিলে প্রথমে পেয়ারার গায়ে ছোট ছোট বাদামি রঙের দাগ দেখা দেয়। দাগগুলো ক্রমান্বয়ে বড় হয়ে পেয়ারার গায়ে ক্ষতের সৃষ্টি করে। আক্রান্ত ফল পরিপক্ব হলে অনেক সময় ফেটে যায়। এ রোগ দমনের জন্য গাছের নিচে ঝরে পড়া পাতা ও ফল সংগ্রহ করে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। গাছে ফুল ধরার পর টপসিন-এম প্রতি লিটার পানিতে দুই গ্রাম মিশিয়ে ১৫ দিন অন্তর স্প্রে করতে হবে।

ভালোভাবে যত্ন নিলে একটি পূর্ণবয়স্ক গাছে গ্রীষ্মকালে ৬০ থেকে ৭০ কেজি এবং হেমন্তকালে ৫০ থেকে ৬০ কেজি ফলন পাওয়া যায়।