প্রতিবছরই অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে বিপুল কৃষি জমি

দেশে কৃষি জমি সুরক্ষার যথাযথ আইন থাকায় প্রতি বছরই বিপুল পরিমাণ জমি চলে যাচ্ছে অকৃষি খাতে। যথেচ্ছাভাবে বাড়ছে কৃষি জমির ব্যবহার। ফলে কৃষি ও শিল্পের জমি চিহ্নিত করা যাচ্ছে না। পাশাপাশি রাতারাতি ভরাট হয়ে যাচ্ছে খাল-বিল, ডোবা-নালা। মূলত অপরিকল্পিত নগরায়ন ও শিল্পায়নের কারণেই আশঙ্কাজনকভাবে কৃষি জমি কমে যাচ্ছে। যা তীব্র করছে দেশের খাদ্য নিরাপত্তার হুমকি।

বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা- এ পরিস্থিতিতে দ্রুত কৃষি ভূমি রক্ষায় সমন্বিত নীতিমালা গ্রহণ না করা হলে সামনে ভয়াবহ বিপর্যয় অপেক্ষা করছে। অথচ ৬ বছর ধরে ঝুলে আছে কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন। তবে সরকার ২০১৭ সালের মধ্যে ভূমি জোনিংয়ের লক্ষ্য ঠিক করেছে। আর ভূমিমন্ত্রীসহ সংশ্লিষ্ট সবাই কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইন দ্রুত পাশ করার বিষয়ে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন। এমনকি খোদ প্রধানমন্ত্রীও সম্প্রতি কৃষি চিহ্নিত করার কথা বলেছেন। ভূমি মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট সূত্রে এ তথ্য জানা যায়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, ভূমি ও কৃষি জমি রক্ষায় রাষ্ট্রের সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে অপরিকল্পিতভাবে ব্যাপক হারে কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। যেখানে সেখানে গড়ে উঠছে বাড়ি। নির্মাণ করা হচ্ছে শিল্প প্রতিষ্ঠান, রাস্তা, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার দোকানসহ বিভিন্ন রকমের স্থাপনা। হচ্ছে অপরিকল্পিত নগরায়ন। ফলে গ্রামের কৃষি জমি দ্রুত অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। এমনকি দেশে সংরক্ষিত ভূমি বলতেও এখন কিছু নেই। যদিও দেশে জলাধার, বন রক্ষায় আইন ও নীতিমালা রয়েছে কিন্তু সরকারের মনিটরিংয়ের অভাবে কেউ তার তোয়াক্কা করছে না।

অথচ বাংলাদেশের প্রায় ১৬ কোটি মানুষের জন্য চাষযোগ্য জমি রয়েছে মাত্র ৮০ লাখ ৩০ হাজার হেক্টর। এখন ওই জমির এক-চতুর্থাংশই হুমকির মুখে। কারণ বাণিজ্যিক কারণে দেশে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৯৬ বিঘা বা ৬৯২ একর কৃষি জমি হারিয়ে যাচ্ছে। রূপান্তরিত জমির পুরোটাই অকৃষি খাতে ব্যবহৃত হচ্ছে। জলাশয় ভরাট করে প্রতিদিন মোট কৃষি জমি কমছে ৯৬ বিঘা। পাশাপাশি তামাক চাষের কারণে প্রতিদিন ৯ হাজার একর কৃষি জমির উর্বরতা নষ্ট হচ্ছে।

এভাবে কৃষি জমি কমতে থাকলে দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির সম্মুখীন হবে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত ১১ বছরে মোট ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ একর কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে গেছে। অথচ এদেশের মোট ভূমির পরিমাণ ৩ কোটি ৫৭ লাখ ৬৩ হাজার একর। বিভিন্ন গবেষণার তথ্যানুযায়ী দেশে বছরে প্রায় ২৫ লাখ মানুষ বাড়ছে। আর প্রতিবছরে নদীগর্ভে বিলীন হচ্ছে এক হাজার হেক্টর জমি।

তাছাড়া ৮০ শতাংশ সরকারি খাস জমিতে সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেই। নির্মাণ কাজের কারণে বছরে বিলীন হচ্ছে ৩ হাজার হেক্টর জমি। গত ৩৭ বছরে শুধু ঘরবাড়ি নির্মাণ হয়েছে প্রায় ৬৫ হাজার একর জমিতে। অথচ বিগত ৫ বছরেও আলোর মুখ দেখেনি জাতীয় ভূমি ব্যবহার নীতি ২০১০ এবং কৃষিজমি সুরক্ষা ও ভূমি জোনিং আইন-২০১০।

সূত্র জানায়, কৃষি অর্থনীতির সাথে এদেশের তিন-চতুর্থাংশ মানুষই সরাসরি জড়িত। কৃষি উৎপাদন ও কৃষিবিপণন প্রক্রিয়ার সাথে সম্পৃক্ত থেকে ওসব মানুষের জীবন-জীবিকা চলে। কিন্তু এদেশে বর্তমানে অপরিকল্পিত আবাসন প্রকল্প, শিল্পায়ন এবং নগরায়নের ফলে কৃষি জমির পরিমাণ ক্রমগত কমছে। পরিসংখ্যান মতে- দেশে মোট ৮ দশমিক ৫২ মিলিয়ন হেক্টর কৃষি জমি আছে। ওই জমিতেই দেশের কৃষকরা কৃষিপণ্য উৎপাদন করে থাকেন এবং দেশের মানুষের খাদ্যের চাহিদা পূরণ হয়। অথচ তা থেকে প্রতিবছর ৬৮ হাজার ৭৬০ হেক্টর চাষাবাদ যোগ্য জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে।

১৯৭৬ সালে বাংলাদেশে আবাদি জমির পরিমাণ ছিল ৯ দশমিক ৭৬২ মিলিয়ন হেক্টর। গত ৩৮ বছরের এ জমির পরিমাণ কমেছে ১ দশমিক ২৪২ মিলিয়ন হেক্টর। অপরিকল্পিত শিল্পায়ন ও নগরায়নের জন্য কৃষি জমি অকৃষি জমিতে পরিণত হচ্ছে। এভাবে কৃষি জমি কমতে থাকলে দেশের ৬৮ শতাংশ মানুষের জীবন-জীবিকা চরম হুমকির মুখে পড়বে। অথচ দেশে কৃষি জমি অকৃষি খাতে ব্যবহার করা যাবে না এমন আইন রয়েছে। কৃষি জমি অন্য খাতে ব্যবহার করতে হলে সরকারি অনুমোদনের বিষয় আছে। তাছাড়া জলাধার সুরক্ষা আইন, বনভূমি ও পাহাড় রক্ষায়ও আইন রয়েছে। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে কোনো আইনেরই যথাযথ প্রয়োগ নেই।

সূত্র আরো জানায়, মৃত্তিকা সম্পদ উন্নয়ন ইনস্টিটিউট (এসআরডিআই) গবেষণার তথ্যানুযায়ী বাংলাদেশে কৃষক পরিবারের সংখ্যা ১ কোটি ৫১ লাখ ৮৩ হাজার ১৮৩টি। তাদের শতকরা প্রায় ৬০ ভাগই প্রান্তিকক পর্যায়ের কৃষক। কৃষিজমি অকৃষিতে রূপান্তরিত হওয়ায় ওই প্রান্তিক কৃষকরা সংসারের হিসাব মিলাতে পারছে না। এসআরডিআই হিসাব অনুযায়ী বিভাগওয়ারি অকৃষি খাতে জমি চলে যাওয়ার প্রবণতা চট্টগ্রাম বিভাগেই সবচেয়ে বেশি। ওই বিভাগে প্রতিবছর ১৭ হাজার ৯৬৮ হেক্টর জমি অকৃষি খাতে চলে যাচ্ছে। রাজশাহী বিভাগে ১৫ হাজার ৯৪৫ হেক্টর, ঢাকায় ১৫ হাজার ১৩১ হেক্টর, খুলনায় ১১ হাজার ৯৬ হেক্টর, রংপুরে ৮ হাজার ৭৮১ হেক্টর, বরিশালে ৬ হাজার ৬৬১ হেক্টর জমি প্রিিতবছর অকৃষি জমিতে পরিণত হচ্ছে।

তাছাড়া বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর ২০১৫ সালের তথ্য অনুযায়ী দেশে আবাদযোগ্য জমি ৮৫ লাখ ৫ হাজার ২৭৮ দশমিক ১৪ হেক্টর। সেচকৃত জমি ৭১ লাখ ২৪ হাজার ৮৯৫ দশমিক ৪১ হেক্টর। তাছাড়াও আবাদযোগ্য পতিত জমি রয়েছে ২ লাখ ৪৩ হাজার ৬৬ দশমিক ২৪ হেক্টর। বর্তমানে দেশে মোট ভূমির পরিমাণ প্রায় ১৪ দশমিক ৪ মিলিয়ন হেক্টর। যার প্রায় ১৩ দশমিক ৩ শতাংশ জুড়ে বনভূমি। ২০ দশমিক ১ শতাংশে স্থায়ী জলাধার, ঘরবাড়ি, শিল্প-কারখানা, রাস্তাঘাট ইত্যাদি, অবশিষ্ট ৬৬ দশমিক ৬ শতাংশ জমি কৃষি কাজের জন্য ব্যবহার করা হয়। জমি কমায় আগামী ১০ বছরেই দেশে খাদ্যনিরাপত্তা সঙ্কট তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

কারণ দেশে ২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত ১১ বছরে মোট ২৬ লাখ ৫৫ হাজার ৭৩১ একর বা ৮০ লাখ ৩৩ হাজার বিঘা কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে গেছে। এই হিসেবে বছরে এই রূপান্তরের পরিমাণ ৭ লাখ ৩০ হাজার ৩২৬ বিঘা জমি। আর প্রতিদিন কমছে ২ হাজার বিঘা কৃষি জমি। বিপুল পরিমাণ এ কৃষি জমির ৮০ শতাংশই বাড়ি নির্মাণের কাজে ব্যবহৃত হয়েছে। দোকানপাট নির্মাণে ব্যবহৃত হচ্ছে ২ দশমিক ৬ শতাংশ আর অন্যান্য কাজে ব্যবহৃত হচ্ছে ১৭ দশমিক ৪ শতাংশ। আর অন্যান্য কাজের মধ্যে রয়েছে কারখানা স্থাপন, তামাক ও চিংড়ি চাষ, ইটভাঁটি নির্মাণ প্রভৃতি।

এদিকে প্রস্তাবিত কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমি ব্যবহার আইনের খসড়ায় বলা হয়েছে কৃষিজমিতে আবাসন, শিল্পকারখানা, ইটভাঁটি বা অন্য কোনো রকম অকৃষি স্থাপনা নির্মাণ করা যাবে না। জমি যে ধরনেরই হোক না কেন তা কৃষি জমি হিসেবেই ব্যবহার করতে হবে। দেশের যে কোনো স্থানের কৃষি জমি এ আইনের মাধ্যমে সুরক্ষিত হবে এবং কোনোভাবেই তা ব্যবহারে পরিবর্তন আনা যাবে না। এমনকি কোনো অবস্থাতেই উর্বর জমিতে স্থাপনা নির্মাণের অনুমতিও দেয়া যাবে না। যে কোনো ধরনের জমির শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না। আইনে বিচার ও দণ্ড হিসেবে বলা হয়েছে- আইন লঙ্ঘনকারী বা সহায়তাকারীর অনুর্ধ ২ বছর কারাদ- বা সর্বনিম্ন ৫০ হাজার টাকা থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থদ- কিংবা উভয়দের দণ্ডিত হবে। এ আইনের অধীনে অপরাধ আমলযোগ্য, জামিনযোগ্য ও আপোসযোগ্য হবে এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) বা সংশ্লিষ্ট রাজস্ব কর্মকর্তা কিংবা বন ও মৎস্য বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা মামলা করতে পারবেন।

অন্যদিকে নগর বিশেষজ্ঞরা বলছেন- এদেশের ভূমি ব্যবহারের সমন্বিত কোনো পরিকল্পনা নেই। ফলে রাষ্ট্র জমির পরিকল্পিত ব্যবহার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হচ্ছে। ফলে দিন দিন জমির পরিমাণ কমছে। দেশ এগিয়ে চরম সঙ্কটের দিকে। এর ফলে ভবিষ্যতে এদেশের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্চ হবে মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা। গ্রামে জমি রক্ষায় বিচ্ছিন্নভাবে বাড়ি নির্মাণ না করে গ্রামগুলোকে ছোট ছোট শহরে পরিণত করা যেতে পারে। জমি রক্ষায় বহুতল ভবনে একাধিক পরিবারের আবাসন ব্যবস্থা করা এখন জরুরি। তাহলে কৃষি জমি অকৃষি খাতে চলে যাওয়ার প্রবণতা কিছুটা হলেও হ্রাস করা সম্ভব হবে।

কৃষি জমি সুরক্ষা আইন প্রসঙ্গে ভূমিমন্ত্রী শামসুর রহমান শরীফ সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেন- কৃষি জমি সুরক্ষা ও ভূমির সুষ্ঠু ব্যবহার আইন শিগগিরই চূড়ান্ত হচ্ছে। এর ফলে ভূমির যথেচ্ছা ব্যবহার রোধ হবে এবং কৃষক তাদের সোনালি ফসল ঘরে তুলে দেশে খাদ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনসহ বিদেশে খাদ্য রফতানি করতে সক্ষম হবে। অযৌক্তিকভাবে যাতে কৃষি জমির ব্যবহার না হয় সেজন্যই এই আইন করা হচ্ছে। ২০১৭ সাল নাগাদ ভূমি জোনিং করা হবে। তাছাড়া প্রত্যেক নাগরিকের জন্য এবং জনস্বার্থে ভূমির ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে বলেও ভূমিমন্ত্রী মন্তব্য করেন।

কৃষি সুরক্ষা বিষয়ে ভূমিমন্ত্রী আরো বলেন- জনবহুল এদেশে ভূমি বাড়ছে না। তবে সমুদ্র ও নদী থেকে কিছু জমি বাড়ছে। এদেশে ভূমি সমস্যা অনেক দিনের। ঔপনিবেশিক সরকার আমলেও সমস্যা ছিল। এ কারণে সাধারণ মানুষকে হয়রানির শিকার হতে হয়েছে।

 

Top
%d bloggers like this: