নরসিংদীর কলম্বো লেবু যাচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে ইউরোপে

কাপড় ও সবজির কারণে নরসিংদীর খ্যাতি দেশজুড়ে। দেশের সীমানা ছাড়িয়ে এবার বিদেশেও নরসিংদীকে পরিচয় করিয়ে দিচ্ছে বাণিজ্যিকভাবে চাষকৃত ‘কলম্বো’ জাতের সুগন্ধি লেবু। অর্থনৈতিকভাবে লাভজনক হওয়ায় জেলা জুড়ে বাণিজ্যিকভাবে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এ লেবুর চাষের আবাদ। আর দেশের সীমানা ছাড়িয়ে মধ্যপ্রাচ্য ও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলোতে কদর বাড়ছে নরসিংদীর সুগন্ধি কলম্বো লেবুর।

বর্তমানে নরসিংদীর চার উপজেলা শিবপুর, রায়পুরা, বেলাব ও মনোহরদীতে বাণিজ্যিকভাবে ৩০০ হেক্টর জমিতে ১১শ’টি বাগানে কলম্বো লেবুর আবাদ হচ্ছে। এসব এলাকার উৎপাদিত কলম্বো লেবু দেশের চাহিদা মিটিয়ে মধ্য প্রাচ্যসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত ২৭টি দেশে রফতানি হচ্ছে।

Lebu-kolombo

নরসিংদী কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বছর-দশেক আগে নরসিংদীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতর পরীক্ষা করে নিশ্চিত হয়, এখানকার মাটি লেবু চাষের উপযোগী। এরপর জেলার কয়েকজন কৃষক প্রাথমিকভাবে স্বাদ ও সুগন্ধিযুক্ত কলম্বো লেবুর আবাদ শুরু করে আশানুরূপ ফলন পান। পরবর্তী সময়ে জেলার চারটি উপজেলায় লেবু চাষের কর্মসূচি গ্রহণ করে কৃষি বিভাগ। বর্তমানে বিদেশে রফতানিকৃত লেবুর মোট ৭০ শতাংশই নরসিংদী থেকে যাচ্ছে।

শিবপুরের মাছিমপুর ইউনিয়নের দত্তেরগাঁও ভিটিপাড়া এলাকার লেবুচাষি খন্দকার মাহবুবুর রহমান বলেন, ‘২০০৩ সালে আমি যখন লেখাপড়া শেষ করে চাকরি পাচ্ছিলাম না, তখন এলাকার এক আত্মীয়ের পরামর্শে এক বিঘা জমিতে লেবুর বাগান করি। মাস ছয়েক পরেই ঢাকা থেকে এক পাইকার এসে আমার বাগান থেকে প্রায় তিন হাজার ৩০০ পণ (২০ হালিতে এক পণ) লেবু কিনে নেন। এতে প্রায় দেড় লাখ টাকা পাই। এরপর এলাকার অনেকেই বাগান করার প্রতি ঝুঁকে পড়েন। বর্তমানে আমার ৫ বিঘা জমিতে চারটি বাগান রয়েছে। এতে তার খরচ হয় প্রায় ১ লক্ষ টাকা। ইতিমধ্যে তিনি প্রায় ৪ লক্ষ টাকার লেবু বিক্রি হয়েছে। তিনি আরও ৩ থেকে ৪ লক্ষ টাকার বিক্রি করতে পারবো বলে আশা করছি।’

একই উপজেলার কৃষক আবদুল হামিদ ৫ বিঘা জমিতে লেবু চাষ করছেন জানান। যাবতীয় খরচ বাদে তার আয় হয় ৫ থেকে ৭ লাখ টাকা।

4_80458একই উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামের বাবুল চৌধুরী বলেন, ‘আমি পাঁচ বছর আগে স্থানীয় কৃষি অফিসের সহায়তায় প্রথমে এক বিঘা জমিতে লেবুর বাগান করি। তুলনামূলক কম পরিশ্রমে বেশি লাভ হওয়ায় পরবর্তী সময়ে লেবু বিক্রির টাকা দিয়ে পর্যায়ক্রমে ১৩ বিঘা জমি কিনে লেবু চাষ করছি। এতে খরচ পড়ে পাঁচ লাখ টাকার মতো, আর লাভ হয় ১৫ লাখ টাকা।

শিবপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মোঃ নাজমুল কবির জানান, বর্তমানে সৌদি আরব,কানাডাসহ ইউরোপীয় ইউনিয়নে কলম্বো লেবু রপ্তানী হচ্ছে। বিষমুক্ত হওয়ায় বিদেশিরা এখানকার লেবু ক্রয় করতে আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ফলন ও বাজার দর ভাল হওয়ায় এই কলম্বো লেবুর চাষ করে কৃষকরা আর্থিক ভাবে লাভবান হচ্ছে।

রায়পুরা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ড.সাফায়াত আহম্মেদ সিদ্দিকী জানান, বিদেশের বাজারে চাহিদা বাড়তে থাকায় রায়পুরার কৃষকেরা কলম্বো লেবু আবাদে আগ্রহী হয়ে উঠেছেন। এ উপজেলায় এ বছর ৭০টির অধিক নতুন লেবু বাগান করা হয়েছে। এসব বাগানের আয়তন কমবেশি এক বিঘা। একইভাবে পলাশ ও মনোহরদী উপজেলায়ও দিন দিন বাড়ছে কলম্বো লেবু চাষের ব্যাপকতা।

নরসিংদীর কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের উপ-পরিচালক লতাফত উদ্দিন জানান, কলম্বো লেবুর উৎপাদন বৃদ্ধিতে কৃষি বিভাগ কাজ করে যাচ্ছে। মাঠ পর্যায়ে কৃষি কর্মকর্তারা লেবু চাষিদের পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। প্রত্যেক বছর নতুন বাগান তৈরি ও পুরাতন বাগান ব্যবস্থাপনার আওতায় এনে কৃষকদের প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণ ও উপকরণ বিতরণ করা হচ্ছে। এছাড়া লাভজনক হওয়ায় চলতি বছর নতুন করে আরো লেবু বাগান তৈরি করছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ।

তিনি আরো জানান, ইউরোপীয় ইউনিয়নের সদস্যরা সরেজমিন নরসিংদীর শিবপুরের ভিটেপাড়ায় বেশ কয়েকটি কলম্বো লেবুর বাগান পরিদর্শন করে সন্তোষ প্রকাশ করেন।

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this: