লিচুর রোগ ও তার প্রতিকার

লিচুর রোগ ও তার প্রতিকার

১। রোগের নাম: পাতার দাগ (Leaf spot)

রোগের কারণঃ Pestalotia sp. নামক ছত্রাক

রোগের বিস্তার:

গ্রীষ্মকালে রোগের তীব্রতা বাড়ে। আক্রান্ত পাতা থেকে জীবানু বিস্তার লাভ করে।

রোগের লক্ষণ:

১. প্রথমে পাতার উপর ছোট বাদামী রঙের দাগ পড়ে।
২. দাগগুলো ক্রমান্বয়ে বাড়তে থাকে এবং বড় দাগের সৃষ্টি করে।
৩. বয়স্ক পাতায় আক্রমণ বেশী দেখা যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা

১. গাছের মরা ডালপালা ছাঁটাই করে ফেলতে হবে।
২. পরিচছন্ন চাষাবাদ পদ্ধতি মেনে চলতে হবে।
৩. টিল্ট ২৫০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।

২। রোগের নাম: অ্যানথ্র্রাকনোজ (Anthracnose)

রোগের কারণঃ Colletotrichum gloeosporioides নামক ছত্রাক

রোগের বিস্তার:

আর্দ্র ও গরম আবহাওয়ায় রোগের প্রকোপ বেড়ে যায়।

রোগের লক্ষণ:

১. সংগ্রহোত্তর লিচুর একটি প্রধান সমস্যা।
২. রোগের আক্রমণে ফল-এর উপর বাদামী দাগের সৃষ্টি হয় যাতে ফলের বাজার দর কমে যায়।
৩. বেশী আক্রান্ত ফল নষ্ট হয়ে খাওয়ার অনুপযুক্ত হয়ে যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা

১. ১০ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রায় গুদামজাত করতে হবে।
২. ফল সংগ্রহ, প্যাকেজিং, পরিবহন ও বাজার জাত করার সময় আক্রান্ত ফল বেছে বাদ দিতে হবে।
৩. ফল গাছে থাকা অবস্থায় টিল্ট ২৫০ ইসি প্রতি লিটার পানিতে ০.৫ মিলি হারে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর স্প্রে করতে হবে।

৩। রোগের নাম: ডাউনি মিলডিউ (Downy mildew)

রোগের কারণঃ Peronophythora litchii নামক ছত্রাক

রোগের বিস্তার:

আর্দ্র আবহাওয়া রোগের আক্রমণের জন্য অনুকুল অবস্থার সৃষ্টি করে।

রোগের লক্ষণ:

১. রোগের জীবাণুু মুুকুলে, কচি ফলে এবং নতুন ডগায় সাদা পাউডারের আবরণ সৃষ্টি করে।
২. দৃশ্যমান সাদা পাউডার প্রকৃৃতপক্ষে ছত্রাকজালিকা এবং বীজঅণুর সমষ্টি।
৩. জীবাণু মুকুল থেকে অতিরিক্ত খাদ্যরস শোষণ করার ফলে আক্রান্ত মুুুকুল শুকিয়ে যায়।
৪. ফলের উপর পানি ভেজা দাগ দেখা যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা:

১. পানি স্প্রে করেও রোগের প্রকোপ কমানো সম্ভব।
২. মুুকুলে সাদা পাউডারের আবরণ দেখা দিলেই গন্ধকযুক্ত ছত্রাকনাশক (থিওভিট/কুমুুলাস/রনোাভিট) প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে ১০ দিন পর পর ২ বার স্প্রে করতে হবে।

৪। রোগের নাম: ফল ঝরা রোগ (Fruit dropping)

রোগের কারণঃ ছত্রাক ও শারীরবৃত্তীয়

রোগের বিস্তার:

১. ফল ঝরা লিচুর সাধারণ সমস্যা।
২. আবহাওয়া শুষ্ক হলে বা গাছে হরমোনের অভাব থাকলে ফল ঝরে পড়তে পারে।

রোগের লক্ষণ:

গুটি অবস্থায় ফল ঝরে পড়ে। ফল বাদামী থেকে কাল রং ধারণ করে।

দমন ব্যবস্থাপনা:

১. শুষ্ক আবহাওয়া বিরাজ করলে সেচের ব্যবস্থা করতে হবে।
২. ফল মটর দানা এবং মার্বেল আকার অবস্থায় প্লানোফিক্স অথবা মিরাকুলান ৪.৫ লিটার পানিতে ২ মিলি হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
৩. গুটি বাধার পর জিংক সালফেট প্রতি লিটার পানিতে ১০ গ্রাম হারে মিশিয়ে গাছে স্প্রে করতে হবে ।
৪. রোগ ও পোকার আক্রমণ প্রতিহত করতে হবে।

৫। রোগের নাম: ফল ফেটে যাওয়া (Fruit cracking)

রোগের কারণ: শারীরবৃত্তীয়

রোগের বিস্তার:

১. দীর্ঘ খরার পর হঠাৎ বৃষ্টি, শুষ্ক ও গরম হাওয়া, রোগ ও পোকার আক্রমণ বেশী হয়।
২. মাটিতে ক্যালসিয়ামের অভাব হলে ।
৩. আগাম জাতে এ সমস্যা বেশী হয়।

রোগের লক্ষণ:

১. দীর্ঘ সময় খরা চলতে থাকলে ফলের বাহিরের খোসা শক্ত হয়ে যায়।
২. এরপর হঠাৎ বৃষ্টি হলে ফলের বৃদ্ধি শুরু হয়।
৩. বাহিরের খোসা শক্ত থাকায় ফলের ভিতরের অংশের সাথে সুষমভাবে বাড়তে পারে না তাই খোসা ফেটে যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা:

১. মাটিতে জৈব সার প্র্রয়োগ এবং খরা মৌসুমে নিয়মিত সেচ প্রদান করতে হবে।
২. প্রতি বছর প্রতি গাছের গোড়ায় ক্যালসিয়াম সার (ডলোচুন – ৫০ গ্রাম) প্রয়োগ করতে হবে।
৩. গুটি বাধার পর পরই প্লানোফিক্স বা মিরাকুলান ৪.৫ লিটার পানিতে ২ মিলি হারে মিশিয়ে স্প্রে করতে হবে।
৪. বোরিক এসিড প্রতি লিটার পানিতে ২ গ্রাম হারে মিশিয়ে গাছে স্প্রে ও ফল ফেটে যাওয়া রোধ করা যায়।

৬। রোগের নাম: ফল শুকিয়ে যাওয়া (Fruit drying)

রোগের কারণ: শারীরবৃত্তীয় ও প্রখর রোদ।

রোগের বিস্তার:

অতিরিক্ত রোদ, শুষ্ক ও গরম হাওয়ায় রোগ বেশী হয়।

রোগের লক্ষণ:

১. এক নাগাড়ে লিচুর এক পাশে রোদ লাগলে লিচুর ত্বক শুকিয়ে যায়।

দমন ব্যবস্থাপনা:

১. গাছের গোড়ায় সপ্তাহে ২ বার পানি প্রয়োগ করতে হবে।

২. বিকাল বেলায় গাছে পানি স্প্রে করতে হবে।

 

ড. কে, এম, খালেকুজ্জামান ।।
উর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা (উদ্ভিদ রোগতত্ত্ব)
মসলা গবেষণা কেন্দ্র, বিএআরআই
শিবগঞ্জ, বগুড়া।

Top
%d bloggers like this: