বিলুপ্ত চুকুর চাষ ও সম্ভাবনা

Chukai1-600x600

ধামরাই উপজেলায় সজাগ (সমাজ ও জাতি গঠন), শৈলান, ধামরাই, ঢাকা কর্তৃক বিগত দুই বছর যাবৎ বিলুপ্ত চুকুর চাষ করে ব্যাপক সম্ভাবনার পথ দেখালো। বাংলাদেশ পাট গবেষণা ইনিষ্টিটিউট থেকে ভিএম-১ (চুকুর) নামে উন্নত জাত ২০১০ সালে অবমুক্ত হয়। পূর্বেও দেশে চুকুর নামে এ ফসলটি অনেকের বাড়ীতেই ছিল।

১৯৮৮ সালের বন্যার পর অনেক স্থান থেকে এ ফসলটি বিলীন হয়ে যায়। বিগত ২০১৩ সালে সজাগ কর্তৃক ১০০ গ্রাম চুকুর বীজ পাট গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে সংগ্রহ করে কাওয়ালীপাড়া, ধানতারা, দেওহাটা, সজাগ অফিসে এবং স্থানীয় উৎসাহী ব্যক্তিদের মাধ্যমে চাষ শুরু করা হয়। কাওয়ালীপাড়া, ধানতারা ও দেওহাটা অফিস প্রাঙ্গনে চাষ করে আশানুরূপ ফসল পাওয়া যায় এবং বিভিন্ন পদ্ধতিতে খাওয়ার অভ্যাস করা হয়। খাদ্য হিসেবে চুকুর চাষে অনেকেই উৎসাহ প্রকাশ করেন। বিগত ২০১৪ সালে পুনরায় পাট গবেষণা প্রতিষ্ঠান থেকে ৫ কেজি চুকুর বীজ সংগ্রহ করা হয় এবং সজাগের প্রত্যেক শাখা ও কৃষকের মাঝে বীজ বিতরণ করা হয়। চুকুর চাষ ধামরাই অঞ্চলে ব্যাপক সম্প্রসারণের সম্ভাবনা রয়েছে। এ প্রত্যাশায় বিলুপ্ত ফসল (চুকুর) চাষ প্রত্যেক গ্রামে গ্রামে সম্প্রসারণের কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে। আগামি ২-৩ বৎসরের মধ্যেই উন্নত জাতের ভিএম-১ চুকুর চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা হবে এবং ব্যবসা ভিত্তিক চাষ সম্প্রসারিত করে অর্থনৈতিক উন্নয়ন সাধনে প্রচেষ্টা চালানো হবে। কেননা চুকুরের পাতা ও ফলে প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন, কেরোটিন, ক্যালসিয়াম, ভিটামিন ও অন্যান্য খাদ্য উপাদান রয়েছে। চুকুরের বীজ থেকে ২০% খাবার তৈল উৎপাদন হয়।

চুকুর চাষে জমি তৈরি :

ধামরাই উপজেলার যেকোন উঁচু জমি ও বসত ভিটায় চুকুর চাষ করা যায়। জমির প্রকার ভেদে ২-৩টি চাষ মই দিয়ে অথবা কোদাল দিয়ে কুপিয়ে জমি প্রস্তুত করতে হবে। নি¤েœ শতক প্রতি সারের পরিমাণ দেওয়া হলো।

এক শতকে গোবর ৮ কেজি

এক শতকে ইউরিয়া সার ২৫০ কেজি

এক শতকে টিএসপি সার ১০০ কেজি

এক শতকে এমওপি সার ১৫০ কেজি

উক্ত সার মাটির সাথে মিশিয়ে জমি প্রস্তুত করতে হবে।

বীজ বপনের ১ মাস পর শতক প্রতি ২৫০ গ্রাম ইউরিয়া পার্শ্ব প্রয়োগ করতে হবে।

বীজ বপন : ফাল্গুন থেকে শ্রাবণ মাস পর্যন্ত বীজ বপন করা যায়। প্রতি শতক জমিতে ৫০ গ্রাম বীজ (২-২.৫০ফুট) দূরত্বে সারি করে বপন করতে হবে । চুকুর পানি সহ্য করতে পারে না। কাজেই বৃষ্টির পানি যাতে না জমতে পারে সেজন্য জমিতে পর্যাপ্ত নালা রাখতে হবে। নাবীতে বীজ বপন করলেও বীজ উৎপাদন করা যাবে। আগাম বীজ বপনে পাতা, বৃতি খাওয়া যাবে ও বীজ উৎপাদন করা যাবে। তবে রোগ পোকা দেখা দিলে দমনের ব্যবস্থা করতে হবে।

ফলন : ১৩০-১৪০ দিনের মধ্যেই ফুল আসা শুরু হবে। কচি অবস্থায় টক হিসেবে কচি পাতা খাওয়া যাবে। পাতা মসৃণ এবং স্বাদেও সুস্বাদু। ফলের উপযোগী বৃতি দিয়ে জ্যাম, জেলি, জুস, তৈরি করা যায়। অনেক দেশে বৃতি দিয়ে কনফেকশনারির খাবার সামগ্রী তৈরি করে থাকে। প্রতি গাছে ৫০-৬০টি ফল ধরে। শতক প্রতি ৫-৭ কেজি ফলন হতে পারে। ফল পাকলে বীজ কেটে ২-৩ দিন রোদে শুকালে বীজ ফেটে যায়। লাঠি দিয়ে হালকাভাবে পিটিয়ে সহজেই বীজ সংগ্রহ করা যায়। পরবর্তী মৌসুমে বপনের জন্য শুকনো বীজ ঠান্ডা করে প্লাষ্টিক অথবা টিনের পাত্রে ভালভাবে রেখে বীজ সংরক্ষন করা যায়। বীজ সংগ্রহের পর শুকনো গাছ জ্বালানী হিসেবে ব্যবহার করা যায়।

চুকুরের নানা সম্ভাবনা :

ক) চুকুরের সবুজ পাতার টক উত্তম খাবার।

খ) পানিতে সিদ্ধ করে লবণ দিয়েই সবুজ চুকুর পাতা খাওয়া যায়।

গ) সবুজ চুকুর পাতা ধুয়ে সিদ্ধ করে লবণ, ঝাল, রসুন দিয়ে বেটে বাটা চুকুর পাতা ভাত দিয়ে খাওয়া যায়।

ঘ) চুকুর পাতার পাপড়ি ধুয়ে সিদ্ধ করে চিনি, তেজপাতা, গরম মশলা দিয়ে জ্বাল দিলেই লাল রংয়ের জেলি তৈরি করা যায়।

ঙ) চুকুর গুটার জেলি দেখতে সুন্দর ও সুস্বাদু।

চ) ব্যাপক চুকুর চাষ করে জেলি উৎপাদন কর্মসূচি গ্রহণ করা যেতে পারে।

ছ) ক্ষুদ্র শিল্পকারখানা গড়ে তোলা যাবে।

জ) পারিবারিকভাবে জেলী তৈরী করেও আয় বৃদ্ধি করা সম্ভব।

ঝ) চুকুর গাছ পানিতে পঁচিয়ে আশ তৈরি করা যায়। যা দিয়ে রশি, ছিকা গৃহে ব্যবহার্য বিভিন্ন উপকরণ তৈরি করা সম্ভব।

চুকুরের চাষের প্রেক্ষাপট :

ক) ১৯৮৮ সালের ভয়াবহ বন্যার পর স্থানীয় জাতের চুকুর চাষ সম্পূর্ণভাবে বিলীন হয়ে যায়।

খ) ২০১৩ সালে প্রথমে পাট গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঢাকা থেকে ১০০ গ্রাম বীজ সংগ্রহ করে সজাগের শাখা অফিস ধানতারা ও কাওয়ালীপাড়া এবং নির্বাচিত ২-৩ জন কৃষকের মাধ্যমে প্রথম চাষ শুরু করা হয়।

গ) উভয় শাখায় আশাব্যঞ্জক ফসল পাওয়া যায় এবং বীজ উৎপাদন করা যায়।

ঘ) অত:পর ২০১৪ সালে দ্বিতীয় বার পাট গবেষণা প্রতিষ্ঠান ঢাকা থেকে ৫ কেজি বীজ সংগ্রহ করা হয়।

ঙ) সজাগ কর্তৃক উৎপাদিত ১ কেজি বীজ তৈরি করা হয়।

চ) ২০১৪ সালে সজাগের প্রত্যেক অফিস এবং সজাগভূক্ত নির্বাচিত কৃষক ও অন্যান্য আগ্রহী কৃষকের মাধ্যমে ধামরাই উপজেলায় বিভিন্ন গ্রামে চুকুর বীজ বিতরণ করা হয়।

ছ) সজাগভূক্ত অফিসসমূহে চুকুর উৎসাহজনকভাবে চাষ করা হয় এবং বহুবিধভাবে খাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়।

জ) চুকুর বীজ প্রাপ্ত কৃষকগণও তাদের আঙ্গিনায় চুকুর চাষ ও নানাবিধ খাবার তৈরি করে উৎসাহবোধ করেন এবং প্রায় সকলেই বীজ উৎপাদন করেছেন।

ঝ) সজাগ থেকে চলতি ২০১৫ সালে ১০ কেজি উৎপাদিত বীজ কৃষকদের মাধ্যমে বিতরণ করার কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

ঞ) এছাড়াও পাট গবেষণা থেকে চলতি বৎসর ২০১৫ সালে আরও ১০ কেজি বীজ সংগ্রহের ব্যবস্থা করা হবে।

ট) চলতি ২০১৫ সালে ধামরাই উপজেলার অধিকাংশ গ্রামে ও সজাগভূক্ত সংযোগ কৃষকদের মাধ্যমে চুকুর চাষ সম্প্রসারণে কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।

ঠ) সম্পূর্ণ বিলুপ্ত প্রাপ্ত চুকুর চাষে ধামরাই উপজেলায় কৃষকদের মনে ব্যাপক আগ্রহ ও উৎসাহ সৃষ্টি করেছে।

ঢ) চুকুর চাষে কুটির শিল্প তৈরি অর্থনৈতিক উন্নয়ন সহ বেকার সমস্যা দূরীকরণ ও কৃষিকাজে নারীদের সম্পৃক্ত করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখবে বলে আশা করা যাচ্ছে।

Top