নারী কৃষি শ্রমিকরা এখনো মজুরি বৈষম্যের শিকার

বাংলাদেশ কৃষি নির্ভরশীল দেশ। ১৬ কোটি মানুষের এদেশে অর্ধেক নাগরিক নারী। সামাজের বিভিন্ন পেশার সঙ্গে সঙ্গে কৃষি কাজেও নারীরা এখন ছেলেদের সঙ্গে সমান পা মেলাচ্ছেন। ক্ষেতে ধানের বীজ বপন থেকে শুরু করে সার দেয়া, আগাছা দমন, কীটনাশক ছিটানো, ধান কেটে ঘরে তোলাসহ সব কাজ তারাই করছেন।

অনেকে আবার বাড়ির পাশে কিংবা উঠানে অনাবাদি জায়গায় শাক-সবজি, ফল-ফলাদির আবাদ করে সংসারে বড়তি রোজগারের পথ করে নিচ্ছে। এতে পরিবারের খরচ মেটানোর পাশাপাশি দেশের সামগ্রিক অর্থনীতিতেও অবদান রাখছে।

দেশের চা শিল্পের মতো সমৃদ্ধ খাতের পেছনে নারী চা শ্রমিকদের বিশাল অবদান রয়েছে। এছাড়া দক্ষিণাঞ্চলে চিংড়ি চাষ, হাঁস-মুরগি পালন থেকে শুরু করে কৃষির প্রায় সব ক্ষেত্রেই নারীর অবদান রয়েছে। আমাদের দেশে মোট শ্রমশক্তির প্রায় অর্ধেক নারী।

এছাড়া ফসল উৎপাদনের পাশাপাশি সবজি চাষ, মসলা উৎপাদন, শুঁটকি ও নোনামাছ প্রক্রিয়াকরণ, মাছ ধরার জাল তৈরি, মাছের পোনা উৎপাদনের কাজও নারীরা করে থাকে। বসতবাড়িতে সামাজিক বনায়ন, গবাদিপশু ও হাঁসমুরগি পালনের কাজও করে নারীরা। কৃষি ও এর উপখাতের মূল চালিকাশক্তি নারী। কিন্তু প্রাতিষ্ঠানিক কোনো পরিসংখ্যানে নারীর এ উপস্থিতির হিসাব নাই। এমনকি কৃষিকাজে জড়িত এ বিপুলসংখ্যক নারী শ্রমিকের কোনো মূল্যায়নও হয় না।

এখন গ্রামীণ সমাজে কৃষি ও চাষের কাজকে নারীর প্রতিদিনের কাজের অংশ বলে বিবেচনা করা হয়। পুরুষ শ্রমিকের সমপরিমাণ কাজ করেও কৃষি খাতে নারী শ্রমিকের বৈধ পরিচিতি নেই। এছাড়া নিয়মহীন নিযুক্তি, দীর্ঘ কর্মঘণ্টা, স্বল্প মজুরি, মজুরি বৈষম্য এবং আরো নানা ধরনের নিপীড়ন তো রয়েছেই। নারী শ্রমিকের ৭২ শতাংশই অবৈতনিক পারিবারিক শ্রমিক। ক্ষুধার বিরুদ্ধে সংগ্রামরত এসব নারীর অবদানের স্বীকৃতি আলোচনার বাইরেই থেকে যায়।

তবে দেশের কৃষিখাতে নারীর ব্যাপক অবদান থাকলেও রাষ্ট্রীয়ভাবে তাদের স্বীকৃতি ও মূল্যায়ন নেই। সরকারের নীতি-কৌশলের সঙ্গে নারীর কৃষিশ্রমের যোগসূত্র এখনো স্থাপিত হয়নি। ফলে রাষ্ট্রীয় প্রণোদনার অংশ হিসেবে ২০১৫ সালে প্রদত্ত এক কোটি ৩৯ লাখ কৃষক কার্ড বিতরণ করা হলেও নারী কৃষকদের ভাগ্যে তা জোটেনি।

এদেশের নারী কৃষি শ্রমিকরা এখনো মজুরি বৈষম্যের শিকার। সারাদিন পুরুষের সঙ্গে সমান পরিমাণ শ্রম দিয়ে নারী শ্রমিক আয় করেন মাত্র ১২০ টাকা। একই কাজ করে যেখানে একজন পুরুষ শ্রমিক মজুরি পান ২০০ টাকা।

বিশ্বব্যাংক পরিচালিত গবেষণা প্রতিবেদন ২০১২ অনুযায়ী অর্থনীতিতে নারীর অবদান সম্পর্কে বলা হয়েছে, অর্থনৈতিক উন্নয়ন, প্রযুক্তির উৎকর্ষতা- সব মিলিয়ে এগিয়েছে মানব সভ্যতা। বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের জীবনমানের পরিবর্তন হলেও সামাজিক ও অর্থনৈতিকভাবে নারী এখনো পিছিয়ে রয়েছে। সামগ্রিক কাজের ৬৬ শতাংশ করে নারী, খাদ্যের ৫০ শতাংশও তারাই উৎপাদন করে অথচ তারা পায় কর্মের মাত্র ১০ শতাংশ।

এছাড়া, ভূমিতেও নারীর সমঅধিকার নেই। বাজারে প্রবেশাধিকারের ক্ষেত্রেও তাদের রয়েছে নানা প্রতিবন্ধকতা। অথচ নারীর অবদান ও অংশগ্রহণকে অস্বীকার করে বৈষম্যহীন সমাজ প্রতিষ্ঠা কিছুতেই সম্ভব নয়। উন্নয়নের অগ্রযাত্রা ত্বরান্বিত করতে নারীর কাজের অর্থনৈতিক মূল্যায়ন ও মর্যাদা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।

 সূত্র- বিডি লাইভ ২৪
Top
%d bloggers like this: