জেনে নেই বৈশাখ মাসে কৃষিতে করণীয়

      No Comments on জেনে নেই বৈশাখ মাসে কৃষিতে করণীয়

জেনে নেই বৈশাখ মাসে কৃষিতে করণীয়

বৈশাখ বাংলা বছরের প্রথম মাস। তাই ছয় ঋতুর প্রথম ঋতু গ্রীষ্মও শুরু হয় এ মাস দিয়েই। এ মাসে থাকে সূর্যের প্রখর তাপ, অন্যদিকে দেখা যায় কালবৈশাখী ঝড়। বৈশাখের এ আবহাওয়ায় মাঠে পাওয়া যায় ধান, পাট, শাকসবজি, মসলা, ভুট্টাসহ আরো অনেক ফসল এবং বনজ ও ফলদ গাছপালা। তবে দেশের উত্তর-পশ্চিম অঞ্চলে চিনিকলে মাড়াই ও গুড় করার জন্য উৎপাদিত হয় আখ ফসল। সর্বোপরি পুকুর, নদ-নদী, খাল-বিলে মাছ চাষসহ হাঁস-মুরগি, গরু-ছাগলের খামারিদের কাজের প্রতিও দৃষ্টি দিতে হয় এ সময়। দেশব্যাপী এ মাসে যেসব মাঠফসলের যত্ন নিতে হয় তা হলো বোরো, রোপা ও বোনা আউশ, ভুট্টা, পাট, আখ, শাকসবজি। বিশেষ করে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের আবাদ করেও চাষি ভাইয়েরা প্রচুর অর্থ আয় করতে পারেন। এ সময় চাষি ভাইয়েরা অনেক রকম ফলেরও আবাদ করেন।
ধান : বোরো ধানের জমিতে এখন থোড় আসার সময়। এ মাসে ফসলে থোড় অবস্থা দেখা গেলে জমির পানি বাড়িয়ে দিতে হবে। জমিতে পানি রাখার এ ব্যবস্থা ধানের দানা শক্ত না হওয়া পর্যন্ত ধরে রাখতে হবে। তবে ধানের দানা যখন শক্ত হয়ে আসে তখনই জমি থেকে পানি বের করে দিতে হবে। এখন বোরো ধান মাজরা পোকা, বাদামি গাছফড়িং, গান্ধি পোকা, লেদা পোকা, সবুজ পাতাফড়িং, পাতা মোড়ানো পোকাসহ বিভিন্ন ধরনের পোকায় আক্রান্ত হয়। সঙ্গে সঙ্গে এ মাসেই বিভিন্ন ধরনের রোগেও বোরো ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সাধারণত যেসব রোগ এ ফসলে দেখা যায় তা হলো বাদামি দাগ রোগ, পাতা ঝলসানো রোগ ও বস্নাস্ট রোগ। এসব কারণে ধানের জমিকে এখন সার্বিক পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। জমিতে এসব রোগ বা পোকা আক্রমণ যাতে না হয় সেদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। জমিতে পোকার আক্রমণ হলে তা দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। ধানের জমির পোকা দমনের জন্য জমিতে বিভিন্ন স্থানে বাঁশের খুঁটি অথবা শাখাযুক্ত ডালপালা পুঁতে দিতে হবে। এর ফলে জমিতে পাখির আনাগোনা বেড়ে যায়। এসব পাখি ডালে বসে এবং তাদের আহার হিসেবে জমির পোকা খেয়ে ফসলকে সুস্থ রাখে।

এ ছাড়া আপনি বোরো ধানের বীজও আবাদ করতে পারেন। অবশ্যই দেখতে হবে এসব জমিতে যেন পর্যাপ্ত পানি থাকে। তবে আপনি কোনো অবস্থাতেই হাইব্রিড ধানের জমি থেকে ভবিষ্যতে আবাদের জন্য বীজ সংগ্রহ করবেন না। এ মৌসুমে অনেকেই হাইব্রিড ধানের আবাদ করেছেন। কেননা হাইব্রিড ধানের বীজ তৈরি করে গবেষণা খামার ও সরকার নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠানগুলো। কারণ হাইব্রিড বীজ হলো জিন দ্বারা প্রক্রিয়াজাত করা একধরনের বিশেষ বীজ। এসব বীজ উৎপাদনের সূক্ষ্ম তাপমাত্রা, পরিমাণমতো সার নির্ধারণ, হিসাব করে জমিতে বীজ বপন ও তার সঠিক পরিচর্যা প্রভৃতি বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি রাখতে হবে।
এ মাসের মাঝামাঝি পর্যন্ত সিলেট অঞ্চলে দেশি আউশ এবং মাসের পুরো সময় ধরেই জমিতে ব্রি-আউশ ধানের জাতগুলো জমিতে রোপণ করা যেতে পারে। তবে লক্ষ্য রাখতে হবে আউশ আবাদের এসব জমিন যেন বন্যামুক্ত হয়। আউশ ধানের জমিতে চারা অবস্থায় দু-তিন বার নিড়ানি দিতে হয়। এতে জমি পরিষ্কার থাকে। এ ছাড়া শ্রাবণের মাঝামাঝি পর্যন্ত জমিতে পোকার আক্রমণ দেখা যায়। মাজরা পোকা এখন ফসলের কুশি বা শীষের ক্ষতি করে। আউশ ফসল এভাবে আক্রান্ত হলে কুশি অবস্থায় ফুল আসার পর গাছের সাদা শীর্ষ দেখা যায়। জমিতে এ পোকা দমনের জন্য সমন্বিত বালাই ব্যবস্থাপনাগুলো অনুসরণ করা উত্তম।
পাট : এ মাসেই তোষা পাটের বীজ বোনার জন্য উপযুক্ত সময়। বর্ষায় পানি দাঁড়ায় না এ ধরনের জমিতেই তোষা পাটের বীজ বুনতে হয়। তোষা পাটের যেসব উন্নত জাত রয়েছে তা হলো ফাল্গুনী তোষা, ও এম-১, ও-৪ এবং ও-৭২। এসব বীজ জমিতে বপনের আগে তা কীটনাশক দিয়ে শোধন করে নিতে হবে। এতে ফসলের বালাইয়ের আক্রমণও কম দেখা যায়। এখন পাটের জমি তৈরি করার জন্য এ মাসেই বৃষ্টির পরে জমিতে চাষ ও মই দিয়ে দিতে হবে। এ ছাড়া জমি তৈরির সময় এতে প্রয়োজনীয় জৈব ও রাসায়নিক সারও দিতে হবে। এখন খরা থাকলে জমিতে সেচ দিতে হবে। এ সময় পাটে ক্ষুদ্র লাল মাকড়ের আক্রমণ দেখা যায়। এ অবস্থায় থাকলে তা থিয়োভিট ৮০ ডবিস্নউ জি অথবা রিপকর্ড ১০ ইসি অথবা সালফোটাক্স ৮০ ডবিস্নউ পি এগুলোর যে কোনো একটি ব্যবহারের মাধ্যমে দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে।
ভুট্টা : এখন ভুট্টা সংগ্রহের সময়। এখন ভুট্টার মোচা খড়ের মতো রঙ হয় এবং এ অবস্থা হলেই গাছ থেকে এসব মোচা সংগ্রহ করতে হয়। আপনি এখন হাঁস-মুরগির খামারি বা গবাদিপশুর মালিকদের কাছে পশুর খাবার হিসেবে এ ভুট্টা সহজেই বিক্রি করতে পারেন এবং নিজের পশুপাখির খাবার হিসেবেও এ ফসল ব্যবহার করতে পারবেন। খরিফ মৌসুমে এখন অনেকে আবার ভুট্টার আবাদও করেছেন। জমিতে ভুট্টার বয়স ২০-২৫ দিন হলে ইউরিয়া সার উপরিপ্রয়োগ করতে হবে। এখন জমিতে ভুট্টা গাছ বেশ বাড়ন্ত পর্যায়ে ও অনেক গাছে এখন ফুল আসে। গাছে ফুল দেখা গেলে তখন গাছের পাতা ছেঁটে দিতে হেব। এ সময় জমিতে

পানি সেচ দেয়া এবং জমির আগাছা পরিষ্কারসহ অনেক স্থানেই প্রয়োজনে সার উপরিপ্রয়োগ করা যায়।
আখ : এ মাসে আখের জমির মাটি চাষ করতে হয়। প্রয়োজন হলে আখ ফসলে সার উপরিপ্রয়োগ করা যায়।
শাক-সবজি : আপনারা অনেকেই এ মাসে গ্রীষ্মকালীন সবজি চাষ শুরু করেছেন। তবে শাসসবজি যারা আগে আবাদ করেছেন তারা এসবের পরিচর্যা করতে পারেন। এ সময় আপনি গ্রীষ্মকালীন টমেটোর আবাদ করতে পারেন। এ জন্য বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট গ্রীষ্মকালীন টমেটোর কয়েকটি জাতও উদ্ভাবন করেছে। এর মধ্যে রয়েছে বারি টমেটো-৪, ৫, ৬, ১০ ও ১১। পরমাণু কৃষি গবেষণা প্রতিষ্ঠান এ সময়ের জন্য দুটি জাত উদ্ভাবন করেছে তা হলো বিনা টমেটো-১ ও ২। এ সময় জমিতে গ্রীষ্মকালীন শাকসবজির বীজ, চারা বা কন্দ বপন বা রোপণ করা যায় যেমন পেঁপে, লালশাক, পুঁই, ডাঁটা, গিমা কলমি, লাউ, বেগুন, চালকুমড়া, মিষ্টিকুমড়া, শসা, ঢেঁড়স, কাঁকরোল, ঝিঙা, মরিচ, শিম, চিচিঙ্গা, করলা, বরবটি একং ওল, মুখিসহ সব ধরনের কচু। এসব লাগানোর জন্য সঠিক দূরত্ব, রোপণ গর্তের আকার বা গভীরতা, সারের পরিমাণ ও প্রয়োগ পদ্ধতি প্রভৃতি বিষয়ে আপনাকে সঠিক ধারণা রাখতে হবে। এ জন্য আপনি নিকটস্থ উপ-সহকারী কৃষি অফিসারের পরামর্শ নিতে পারেন।
মসলা : এ মাসে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষ শুরু করা যেতে পারে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের চারা তৈরি করে নিয়ে পরে তা মূল জমিতে রোপণ করা যায়। এতে পেঁয়াজ চাষ থেকে লাভ বেশি পাওয়া যাবে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের উন্নত জাতগুলোর মধ্যে রয়েছে বারি পেঁয়াজ-২ ও ৩ এবং এন-৫৩। এ মাসে আপনি আদা বা হলুদের রোগমুক্ত, সতেজ কন্দ জমিতে রোপণ করতে পারবেন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইন্সটিটিউট উদ্ভাবিত উন্নত যেসব হলুদের জাত রয়েছে তা হলো বারি হলুদ-১, ২ ও ৩। এ ছাড়া উন্নত আদার জাত হলো বারি আদা-১। আদা ও হলুদ মূল-জাতীয় ফসল বলে এ ফসলের জমির মাটি অনেক গভীর পর্যন্ত আলগা থাকে। এ জন্য জমিতে পানি যেন না দাঁড়ায় সেদিকে চাষি ভাইদের বিশেষ দৃষ্টি রাখতে হবে। এ মাসে বীজতলা তৈরি ও মরিচের বীজ করা যায়। এক থেকে দেড় মাস পরে চারা উঠিয়ে এসব মূল জমিতে রোপণ করা যায়।
ফল : এ সময় আমবাগানের পোকামাকড় দমনের ব্যবস্থা নিতে হবে। এ মাসে ফলে পোকামাকড় বিশেষ করে হপার পোকার আক্রমণ বেশি দেখা যায়। সে ক্ষেত্রে গাছে রেলোথ্রিন ১০ইসি, টাফ্গর ৪০ইসি, সাইপারমার ১০ইসি, সবিক্রন ৪২৫ইসি এগুলোর যে কোনো একটি ব্যবহার করতে পারেন।
গবাদিপশু ও পাখি : এ মাসে কড়া রোদ। এ সময় গবাদিপশুকে বাইরে রাখা যাবে না। গরমে এসব পশু-পাখি অসুস্থ হয়ে পড়তে পারে। তাই গরু-ছাগলকে খোলামেলা ছায়াযুক্ত জায়গায় রাখতে হবে। এ ছাড়া এখন গবাদিপশুকে খাওয়ানোর জন্য সুষম খাবার দিতে হবে। কাঁচা ঘাসের ব্যবস্থা করতে হবে। আপনার পশু এখন বাদলা, তড়কা, ক্ষুরারোগ প্রভৃতির মাধ্যমে আক্রান্ত হতে পারে। এসব রোগ খুবই ক্ষতিকর। এসব রোগ থেকে আপনার পশুকে রক্ষার জন্য পশুপাখিকে প্রতিষেধক টিকা দেয়ার ব্যবস্থা নিতে হবে। খামারি ভাইয়েরা হাঁস-মুরগির বার্ড ফ্লু রোগের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এসব রোগ থেকে রক্ষার জন্য আপনাকে যথাসময়ে হাঁস-মুরগির প্রতিষেধক বা যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। এ ছাড়া এ মাসে মুরগির কলেরা ও রানিক্ষেত এবং হাঁস প্লেগ রোগ দ্বারাও আক্রান্ত হয়। সমস্যা সমাধানে উপজেলা পশুসম্পদ কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
মৎস্য : আপনি মাছ চাষের জন্য নতুনভাবে পুকুর তৈরি করবেন এ মাসেই। তা ছাড়া পুরনো পুকুর হলে এ মাসেই তা শুকিয়ে এবং পুকুরের পাড় মেরামত করে নিতে হবে। এখন পুকুরপাড়ের গাছপালা ছাঁটাইয়ের ব্যবস্থাও নেয়া প্রয়োজন। সম্ভব হলে পুকুরে থাকা জলজ আগাছা দমনের ব্যবস্থাও এখন নিতে হবে। সমস্যা দেখা দিলে উপজেলায় গিয়ে সহকারী মৎস্য কর্মকর্তা/উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেন।
চাষি ভাইয়েরা, আপনাদের মাঠের ফসল, ফলমূল, গাছপালা, গো-সম্পদ ও মৎস্যসম্পদ এ মাসে খুবই কষ্টক্লেশ করে দেখাশোনা করতে হয় এবং এ জন্য আপনাকে প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে এসব কাজ করতে হবে। প্রয়োজনে আপনি স্থানীয় উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তার পরামর্শ নিতে পারেন।

লিখেছেনঃ কৃষিবিদ সরকার মো. আবুল কালাম আজাদ।