ঘরে মাছ চাষ

      No Comments on ঘরে মাছ চাষ

ঘরে মাছ চাষ

‘ডাঙায় চরে রুই-কাতলা!’ সেই কবে মজা করে লিখেছিলেন যোগীন্দ্রনাথ সরকার। এবার সত্যি সত্যি ময়মনসিংহ শহরে পুকুর কিংবা খালের বদলে শিং, পাবদার চাষ হচ্ছে ডাঙায়, একেবারে ঘরের ভেতর। উৎপাদনও অনেক গুণ। দেখতে গিয়েছিলেন শাখাওয়াত উল্লাহ

ঘরে মাছ চাষ

ছাড়া হচ্ছে মাছের পোনা

পুকুরে যেখানে প্রতি ঘনমিটার পানিতে মাছের উৎপাদন মাত্র এক থেকে দুই কেজি, সেখানে ঘরের মধ্যে চাষে উৎপাদন ষাট কেজি পর্যন্ত! শুনে হয়তো খটকা লাগতে পারে। কিন্তু আধুনিক বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষাবাদে এসেছে এই সফলতা। স্বল্প জমি, অল্প পানিতে মাছের উৎপাদন হচ্ছে অন্তত ২৫ গুণ। বছরে ১০ টন শিং-মাগুর মাছ উৎপাদনের জন্য অন্তত ১০ বিঘা পুকুর প্রয়োজন। এ প্রযুক্তিতে মাত্র ৬-৭ কাঠা জমিতে সে পরিমাণ মাছ উৎপাদন সম্ভব।

ময়মনসিংহ শহরের বাসিন্দা আধুনিক মত্স্যচাষী এ বি এম সামসুল আলম। মাছ নিয়ে কেটেছে কুড়িটি বছর। এবার তিনি বিশ্বের সর্বাধুনিক প্রযুক্তি রি-সার্কুলেশন একুয়াকালচার সিস্টেমের আরএএস ক্ষুদ্র ভার্সন মিনি আরএএস প্রযুক্তি ব্যবহার করে মাছ চাষ শুরু করেছেন। শহরের বিসিক শিল্পনগরীর একটি টিনশেডে ১০ টন ধারণ ক্ষমতার ৮টি ট্যাঙ্ক বসিয়েছেন। প্রতিটি ট্যাঙ্ক পাইপ দিয়ে মেকানিক্যাল ফিল্টার যুক্ত। এ ফিল্টার প্রতিটি ট্যাঙ্কের মাছ ও মত্স্য খাদ্যের বর্জ্য পরিষ্কার করে। পরে এ পরিষ্কার পানি পাম্প দিয়ে বায়োফিল্টারে তোলা হয়। মাছের বৃদ্ধি যেন বাধাগ্রস্ত না হয়, সে জন্য পানি পরিশোধন করা হয়। তিনি জানান, ‘সার্বক্ষণিক ফিল্টারিংয়ের ফলে পানি পরিশোধন হয় আর পরিশোধিত পানির ১০ শতাংশ বর্জ্য হিসেবে বের হয়ে যায়। এটি আবার জৈব সার হিসেবে ব্যবহার করা যায়। মাছের খাবার নষ্ট হয় না। সাধারণত পুকুরে অক্সিজেনের স্বল্পতা থাকে, এখানে সে অসুবিধা নেই। ’ ৮০ শতাংশ পানি সম্পূর্ণ শোধন করে পুনর্ব্যবহার করা যায়। মেকানিক্যাল ও বায়োপরিশোধন প্রক্রিয়ায় মাছের বর্জ্য, খাদ্যাবশেষ, দ্রবীভূত এমোনিয়া, কার্বন ডাই-অক্সাইড এসব ক্ষতিকারক গ্যাস ৯০ শতাংশ পর্যন্ত অপসারণ সম্ভব। এসব উপাদান মাছের বৃদ্ধিতে ক্ষতিকারক।

 

বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে যত্নআত্তি হয় বলে মাছের দ্রুত বৃদ্ধি হয় এবং মাছের গুণগত মান হয় উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত। নোংরা খাবার নেই বলে মাছের গন্ধ প্রাকৃতিক থাকে এবং দুর্গন্ধ থাকে না।

 

সামসুল আলম শিং, গুলশা ও পাবদা চাষ করছেন। চার মাসে এগুলো বিক্রির উপযোগী হবে বলে জানান তিনি। তখন প্রতিটি ট্যাঙ্কে প্রায় ছয়শত কেজি মাছ পাওয়া যাবে। মাত্র পাঁচ সপ্তাহে মাছ ওজনে বাড়ছে ১০ গ্রামের বেশি। এই প্রযুক্তিতে মাছের মৃত্যুহার নেই বললেই চলে। লাখে দুয়েকটা মারা যেতে পারে। আর দেখাশোনার জন্য দুজন লোকই যথেষ্ট।

 

১৯৮২ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সমাজবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর করেন সামসুল আলম। এরপর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ও বহুজাতিক সংস্থার সঙ্গে মাছ নিয়ে কাজ করেছেন। ময়মনসিংহের ত্রিশালে গড়ে তুলেছেন খামার। তিনি বাংলাদেশে প্রথম কুচিলা চাষ শুরু করেছেন বলে জানালেন। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বঙ্গবন্ধু কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়সহ বাংলাদেশের বিভিন্ন নামি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা এখানে থিসিসের কাজ করতে আসে।

 

এশিয়ার কয়েকটি দেশ ও বাংলাদেশে এ প্রযুক্তির প্লান্ট নির্মাণ ও সহায়তা দিয়ে থাকে জ্যাক ইন্টারন্যাশনাল। এই প্রতিষ্ঠানের সিইও জাহাঙ্গীর আলী জানান, ‘প্রকল্পটি ব্যয়বহুল, পাশাপাশি খুবই লাভজনক। একটি মিনি আরএএস নির্মাণ করতে খরচ লাগে প্রায় ৫০ লাখ টাকা। তবে দুই থেকে তিন বছরের মধ্যে লাভসহ বিনিয়োগের পুরো টাকাই উঠে আসে। এসব প্লান্ট পঞ্চাশ বছরের বেশি টিকে। তবে এই প্রযুক্তিতে সার্বক্ষণিক নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ দরকার। ’

 

আফ্রিকা ও এশিয়ার কয়েকটি দেশে এই প্রযুক্তি চালু আছে বলে জানান তিনি। এই প্লান্ট যে কেউ চাইলে শুরু করতে পারেন। সারা বছর সমান তালে মাছ উৎপাদন করা যাবে

ট্যাংকে মাছ চাষে ৩০ গুণ বেশি উৎপাদন

ট্যাংকে মাছ চাষে ৩০ গুণ বেশি উৎপাদন

স্বল্প জমি, অল্প পানি ও মাত্র দুজন দেখভাল করার লোক এবং দুটি কামরা। কামরার ভিতর ১০ টন ধারণ ক্ষমতাসম্পন্ন আটটি ট্যাংক। আর এ ট্যাংকেই উৎপাদন হচ্ছে বিভিন্ন প্রজাতির সুস্বাদু মাছ। বিশ্বের সর্বাধুনিক মিনি রি-সার্কুলেশন অ্যাকোয়াকালচার (মিনি আরএএস) প্রযুক্তি ব্যবহার করে বাংলাদেশে এই প্রথম ঘরের ভিতরে সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক উপায়ে মাছ চাষ করে রীতিমতো তাক লাগিয়ে দিয়েছে ‘ফিশ হ্যাচারি ও কালচার ফার্ম অ্যাগ্রো থ্রি’ নামক একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি বলছে, এ পদ্ধতিতে পুকুর থেকে ৩০ গুণ বেশি মাছ উৎপাদন করা সম্ভব। বর্তমানে এখানে আটটি ট্যাঙ্কে ৮৫ হাজার পাবদা, গুলশা ও মাগুরের চাষ হচ্ছে। প্রায় প্রতিদিন আগ্রহী উদ্যোক্তা ও সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত বিজ্ঞানীরা পরিদর্শনে আসছেন। দেশের চাহিদা মিটিয়ে রপ্তানি বাড়াতেও এ পদ্ধতি বড় ভূমিকা রাখবে বলে জানিয়েছেন তারা। এ পদ্ধতিতে বিশ্বের মাত্র কয়েকটি দেশে মাছ উৎপাদন হয়। এর মধ্যে চীন ও ভিয়েতনাম উল্লেখযোগ্য। তবে সেসব দেশে কোরাল, মাগুর ও কই চাষ হয় ব্যাপক হারে।

 

বাণিজ্যিকভাবে প্রায় পাঁচ মাস আগে ময়মনসিংহের মাসকান্দায় বিসিক শিল্পনগরীতে একটি টিনশেড ঘরে এ শিল্পের সূচনা। যেখানে ১০ টন ধারণ ক্ষমতার আটটি ট্যাঙ্কে চাষ হচ্ছে পাবদা, গুলশা, মাগুরের মতো বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। সম্পূর্ণ বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে চাষ হয় বলে দ্রুত বৃদ্ধি এবং মাছের গুণগত মান হয় উন্নত ও স্বাস্থ্যসম্মত। এ প্রযুক্তিতে মাছের মৃত্যুহার নেই বললেই চলে। আগস্টের শুরুতে আটটি ট্যাঙ্কের মধ্যে তিনটিতে ১২ হাজার করে পাবদা, চারটিতে ১২ হাজার করে গুলশা ও একটিতে চার হাজার মাগুর মাছ ছাড়া হয়। ইতিমধ্যে পাবদা বিক্রিও করা হয়েছে গত সপ্তাহে প্রতি কেজি ৬০০ টাকা দরে। আর পরীক্ষামূলকভাবে অন্য একটি পাত্রে চাষ করা হয় বিলুপ্তপ্রায় মহাশোল। চকচকে সোনালি রঙের এ মাছ চাষেও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানটি সফল হয়েছে বলে জানা গেছে। পরবর্তীতে বাণিজ্যিকভাবে মহাশোল চাষ করা হবে। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ মত্স্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাহায্য নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী মশিউর রহমান।

 

জানা যায়, মেকানিক্যাল ও বায়ো-পরিশোধন প্রক্রিয়ায় মাছের বর্জ্য, খাদ্যাবশেষ, দ্রবীভূত অ্যামোনিয়া, কার্বন ডাইঅক্সাইড এসব ক্ষতিকারক গ্যাস ৯০ শতাংশ পর্যন্ত অপসারণ সম্ভব মিনি আরএএস পদ্ধতিতে। এ ছাড়া পুকুরে অক্সিজেনের স্বল্পতা থাকলেও এখানে সে অসুবিধা নেই। মাত্র পাঁচ সপ্তাহে মাছের ওজন বাড়ে ১০ গ্রামেরও বেশি। চার মাসেই হয়ে ওঠে বিক্রির উপযোগী। তবে মিনি রি-সার্কুলেশন অ্যাকোয়াকালচার পদ্ধতিটি অনেকটাই ব্যয়বহুল। ব্যয়বহুল হলেও মাত্র দুই বছরের মধ্যে মুনাফার মুখ দেখা যাবে বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানের কর্তৃপক্ষ। ফিশ হ্যাচারি ও কালচার ফার্ম অ্যাগ্রো থ্রির স্বত্বাধিকারী এ বি এম শামসুল আলম বাদল জানান, পুকুরে যেখানে প্রতি শতাংশে ৪০০ থেকে ৫০০ মাছ চাষ করা যায়, সেখানে এ পদ্ধতিতে প্রতি কিউবিক মিটারে ১ হাজার ২০০ মাছ চাষ করা যায়। ঢাকার সায়েন্স ল্যাবরেটরি মিনি আরএএস পদ্ধতি নিয়ে যৌথভাবে কাজের প্রস্তাব দিয়েছে। তিনি বলেন, জমি সংকটের কারণে বিশ্বে আরএএস একটি জনপ্রিয় পদ্ধতি। বাংলাদেশেও জমি সংকট দেখা দিচ্ছে। তাই সরকারি সহায়তা অথবা ব্যক্তি উদ্যোগে যদি এ পদ্ধতিতে মাছ চাষ করা যায় তাহলে মাছ চাষে বিপ্লব ঘটবে।

 

 মাছ বাঁচাতে মাছ খাওয়া

সামুদ্রিক মাছ যেন শেষ হয়ে না যায়, সেদিকে নজর দিয়েছে জার্মানরা। সামুদ্রিক মাছ বাঁচাতে আফ্রিকার মাগুর মাছের চাষ হচ্ছে জার্মানিতে। মাছের চৌবাচ্চার পানি গরম রাখা হচ্ছে বায়োগ্যাস দিয়ে। চৌবাচ্চার পানি দিয়ে হয় ভুট্টার ক্ষেতে জলসেচ। ভুট্টার গাছপাতা যায় বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে জ্বালানি হয়ে। রিসাইক্লিং-এর চূড়ান্ত!

পোনা মাছগুলো বড় করতে বিশেষ কিছু লাগে না- পানি, এক কিলোগ্রাম দানাপানি আর চৌবাচ্চায় ১৫০ দিন। এগুলো হল আফ্রিকান ক্যাটফিশ বা মাগুর মাছ। চৌবাচ্চার পানি সারাক্ষণ ২৮ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড গরম রাখতে হয়, কেননা মাছটির আসল বাস আফ্রিকায়। পানি গরম রাখার জন্য গ্যাস আসে মাছের ভেড়ির নিজস্ব বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট থেকে। কাজেই কোনো বাড়তি খরচ পড়ে না। চাষি এবং ভেড়ি-মালিক ব্যারন্ড পমারেনে বলেন, ‘আমরা সব কিছু ধরে রাখি এবং সব কিছু আবার পুরোপুরি ব্যবহার করা হয়। ভেড়ির পানি ধরে রেখে তা চাষের জমিতে দেয়া হয়। সেটা রিসাইক্লিং-এর কাজ করে। সেই জমিতে ভুট্টার চাষ করা হয়। সেই ভুট্টার গাছপাতা আবার যায় বায়োগ্যাস প্ল্যান্টে, যেখানে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হয়- যে বিদ্যুৎ দিয়ে মাছের চৌবাচ্চা গরম রাখা হয়।’

শুধু এই ‘ফিশ ফার্ম’ বা মাছের ভেড়ির জন্যেই এই বায়োগ্যাস প্ল্যান্ট বসানো হয়েছে। সরকারি ভর্তুকির ফলে এই বিনিয়োগ লাভজনক হয়েছে। মাছ নিয়ে ব্যবসাটা জার্মান চাষিদের পক্ষে নতুন, সরকারি জ্বালানি নীতিতে পরিবর্তনের ফলে এই নতুন ব্যবসা সম্ভব হয়েছে। ইতিমধ্যেই ৬০টি এ ধরনের খামার আছে। আগামী পাঁচ বছরে তা নাকি বেড়ে দাঁড়াবে ছয়শ’তে।

অবশেষে জার্মানরা মাছের দিকে ঝুঁকছেন। মাছ খাচ্ছেন মাংসের বদলে। আজকাল প্রায়ই লক্ষ্য করা যায় অনেক জার্মানই মাংসের পরিবর্তে নানা ধরনের মাছ খেতে পছন্দ করেন। বিশেষ করে যারা স্বাস্থ্য সচেতন তারা তো অবশ্যই। মাছে তেমন কোনো চর্বি নেই, রয়েছে প্রচুর প্রোটিন, যা শারীরিক ও মানসিকভাবে মানুষকে সতেজ থাকতে সহায়তা করে। ‘ফিশগুট নর্ড’ খামারের মার্কেটিং ম্যানেজার স্টেফান শোয়াববাউয়ার ইউরোপ জুড়ে অ্যাকোয়া কালচার, মানে জলজাত খাদ্য উৎপাদনের প্রবণতার কথা বলেন- ‘আপাতত এটা একটা অর্থকরি ব্যবসা, কেননা মাছের চাহিদা বেড়েই চলেছে এবং সেই সঙ্গে যারা এ ধরনের নতুন ব্যবসায়ে বিনিয়োগ করতে চান, তাদের সংখ্যাও বাড়ছে। সে হিসেবে মডেলটা খুবই ভালো এবং বাড়ানোও যেতে পারে, যদি মানুষজন মাছটা পছন্দ করে।’

সেটাই আসল সমস্যা- কয়েক বছর হল রেস্তোরাঁর কুক ইয়ুর্গেন নয়মান আফ্রিকার মাগুর মাছ রাঁধছেন। প্রথম দিকে না খেলেও খদ্দেররা শেষমেষ সেই মাছ খেতে শুরু করেন, যখন নয়মান তাদের বোঝান যে, এই বিজাতীয় মাছটি খাওয়া হল সামুদ্রিক মাছগুলো বাঁচানোর একটা পথ।