খাদ্যে বিষ: যন্ত্রের ভুল ফলাফলে বেকায়দায় ডিসিসি ও ব্যবসায়ীরা

খাদ্যে বিষ: যন্ত্রের ভুল ফলাফলে বেকায়দায় ডিসিসি ও ব্যবসায়ীরা

 

নিরাপদ খাবার নিশ্চিত করতে রাজধানীর প্রতিটি কাঁচা বাজারে অভিযান চালিয়ে আসছে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন (ডিএনসিসি ও ডিএসসিসি)। খাদ্যপণ্যে ফরমালিন মেশানোর অভিযোগে ব্যবসায়ীদের তারা জেল-জরিমানাও করছেন। কিন্তু যে মেশিন ও কিট দিয়ে ফরমালিন পরীক্ষা করা হচ্ছে, সেগুলোর একটিও সঠিক ফলাফল দিচ্ছে না বলে অভিযোগ ব্যবসায়ীদের। বিক্রেতা তার পণ্যে ফরমালিন থাকার কথা স্বীকার করলেও যন্ত্রে তা ধরা পড়ছে না।

অন্যদিকে যে ফল বা মাছে ফরমালিনের লেশমাত্র উপস্থিতি নেই, সিটি করপোরেশনের সেই যন্ত্র বলছে- তাতে ফরমালিন রয়েছে। পুরো বিপরীত ফলাফল দেওয়া হচ্ছে বলে জানান ব্যবসায়ীরা। ফরমালিন থাকার অভিযোগে ধ্বংস করা হচ্ছে কোটি কোটি টাকার ফল ও মাছ। প্রায়ই বিনা দোষে এই শাস্তি ভোগ করতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। এ নিয়ে বেকায়দায় আছেন দুই সিটি করপোরেশনের কর্মকর্তারাও।

সংশ্লিষ্টরা জানান, দুই সিটি করপোরেশনে ফরমালিন শনাক্তের ২০টি মেশিন রয়েছে। বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (বিসিএসআইআর) উদ্ভাবিত এ যন্ত্রগুলোর কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠলে, বিষয়টি আমলে নেন সিটি করপোরেশন কর্তৃপক্ষ। এরপর সিটি করপোরেশনের পক্ষ থেকে বিষয়টি চিঠি দিয়ে তাদের জানানো হয়।

রমজান শুরুর পর নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে দুই সিটি করপোরেশন ভেজালবিরোধী অভিযান পরিচালনার জন্য কয়েকটি টিম গঠন করে। এর মধ্যে দক্ষিণ সিটিতে কাজ করবে আটটি ভ্রাম্যমাণ টিম। কিন্তু ফরমালিন যন্ত্র ভুল ফলাফল দেওয়ায় ও সঠিক যন্ত্র সংগ্রহ না করায় এবারের রমজান ও ফল মৌসুমে ধারণা বা অভিযোগের ভিত্তিতেই সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে তাদের।

করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের পরিদর্শকরা বলছেন, ক্রেতাদের পাশপাশি বিক্রেতারাও নিশ্চিত করেন যে, মাছে ফরমালিন রয়েছে। কিন্তু ওই মাছ পরীক্ষা করলে যন্ত্রের ফলাফলে দেখা যায়, সম্পূর্ণ ফরমালিনমুক্ত। এভাবে গত দুবছর ধরে চলে আসছে। এসময়ের মধ্যে মাছ ও ফলে কোনও ফরমালিন ধরা না পড়ায়, বিষয়টি নিয়ে নানা প্রশ্ন ওঠে।

এরপর উচ্চ আদালতে রিট হলে ২০১৪ সালের ২৪ নভেম্বর খাদ্য ও ফলমূল পরীক্ষার জন্য সঠিক ফরমালিন যন্ত্র নির্বাচন এবং সংগ্রহ করার নির্দেশ দেন আদালত। কিন্তু দুবছর ধরে চিঠি চালাচালি হলেও এখনও পর্যন্ত বিসিএসআইআর থেকে কোনও উত্তর পায়নি সিটি করপোরেশন। তাছাড়া যন্ত্রও সংগ্রহ করতে পারেনি সংস্থা দুটি। মূলত এরপর থেকেই সিটি করপোরেশনের ফরমালিন শনাক্ত অভিযান বন্ধ রয়েছে।

সিটি করপোরেশন থেকে বিসিএসআইআর-কে পাঠানো ওই চিঠিতে বলা হয়, ‘বিসিএসআইআর উদ্ভাবিত ফরমালিন টেস্ট কিট দিয়ে করপোরেশনের আওতাধীন সব বাজারে সরবরাহকৃত মাছ পরীক্ষা করা হচ্ছে। কিন্তু বর্তমানে এই যন্ত্রগুলো দিয়ে মাছে কোনও ফরমালিনের অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এ অবস্থায় কী উপায়ে ফলে ফরমালিনের উপস্থিতি পরীক্ষা করা হবে, সে বিষয়ে সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট দফতরকে জানাতে অনুরোধ করা হলো।’

ফল বিক্রেতারা বলছেন, বাজারে আসা ফলে কার্বাইড ও ফরমালিন মেশানো হয়। এ দুধরনের রাসায়নিকের মধ্যে কার্বাইড দিয়ে দ্রুত ফল পাকানো হয়। আর ফরমালিন দিয়ে দীর্ঘদিন তাজা রাখা হয়। এসব রাসায়নিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর।

এ বিষয়ে কাওয়ান বাজারের ফল ব্যবসায়ী আনিসুর রহমান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘আমরা দেশের বিভিন্ন এলাকার বাগান থেকে ফল পেড়ে ঢাকায় আনি। হঠাৎ দেখি সিটি করপোরেশন, র‌্যাব ও পুলিশের লোকজন এসে পরীক্ষা করে বলে ফরমালিন আছে। এভাবে আমাদের লাখ লাখ মন ফল ধ্বংস করা হয়েছে। পরে আমরা বিষয়টি চ্যালেঞ্জ করে আদালতে রিট করি। ওই মেশিনগুলো ফরমালিন পরীক্ষার সঠিক যন্ত্র নয় বলে আদালতে প্রমাণিত হয়েছে।’

এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর মাছ ও কাঁচাবাজার ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি আনোয়ার হোসেন শিকদার বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘বছর দেড়েক আগে মাছ পরীক্ষার জন্য অনেকেই আসতো। কিন্তু এখন সিটি করপোরেশনের কেউ আসে না। যে মেশিন দিয়ে পরীক্ষা করা হয় সেগুলো নষ্ট। তবে মৎস্য অধিদফতরের লোকজনকে মাঝে-মধ্যে দেখা যায়। জাপান থেকে আমদানি করা তাদের প্রায় ১৬টি মেশিন রয়েছে। তারা পরীক্ষা করে মাঝে-মাঝে ফরমালিন পায়। অনেককে জেলও দিয়েছে। তবে রমজান মাসে একবারের জন্যও তারা আসেনি।’

রামপুরার বাসিন্দা নাহিদা আক্তার ইফতারের সঙ্গে খাবেন বলে মেরাদিয়া হাট থেকে ফল কিনেছেন। তিনি বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘তারা যা-ই বিক্রি করছে আমরা তা-ই কিনছি। কী আছে না আছে জানি না। তবে ফলের অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ফরমালিন রয়েছে। কারণ, ফরমালিন থাকলে সে ফলে মাছি-মশা বসে না। সরকার যদি এসব ফল পরীক্ষার ব্যবস্থা করে, তাহলে নগরবাসীর স্বাস্থ্য ঝুঁকি কমবে।’

এ বিষয়ে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রধান স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ব্রি. জেনারেল ডা.এস এম এম সালেহ ভূঁইয়া বলেন, ‘কিট বা যন্ত্রগুলো দিয়ে এখন আর ফরমালিন পরীক্ষা করা হচ্ছে না। আমরা নিশ্চিত হতে পেরেছি, এই যন্ত্রগুলো সঠিক সিদ্ধান্ত দিতে পারছে না।’

দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের স্বাস্থ্য বিভাগের সূত্র জানায়, তাদের কাছে ফরমালিন শনাক্ত করার জন্য ১০টি মেশিন রয়েছে। প্রতি মাসে নগরীর বাজারগুলোতে নিরাপদ খাদ্য আইনে পরিচালিত অভিযানের তথ্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠাতে হয়। এই মেশিনগুলো দিয়ে কোনও সফলতা না পাওয়ায় বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছে প্রধানমন্ত্রীর দফতর। তাছাড়া আদালতের নির্দেশনা থাকলেও এখনও পর্যন্ত প্রতিষ্ঠান দুটি ফল ও মাছে ফরমালিন পরীক্ষার সঠিক কোনও যন্ত্রই সংগ্রহ করতে পারেনি।

তবে ডিএসসিসির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা খান মো. বিলাল বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘যন্ত্রগুলো বিকল কিনা তা আমার জানা নেই।’

যন্ত্রের এই দশা সম্পর্কে ডিএসসিসির একজন স্বাস্থ্য পরিদর্শক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, গত দুবছর ধরে মেশিনগুলো দিয়ে পণ্যের ফরমালিন শনাক্ত করা যাচ্ছে না। যন্ত্রগুলো দিয়ে বাজারের ফলমূল ও মাছ পরীক্ষা করলে দেখা যাচ্ছে কোনও ফরমালিন নেই। অথচ যারা বিক্রেতা তারা আমাদেরকে বলছেন, তার কোন মাছে ফরমালিন আছে- আর কোন মাছে নেই।

চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে ২৫ মে পর্যন্ত সময়ে নিরাপদ খাদ্য আইনে স্পেশাল মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে ৮৫টি মামলা করেছে ডিএসসিসি। এই মামলাগুলোর মধ্যে ফরমালিন বা রাসায়নিক সংক্রান্ত কোনও মামলা নেই।

Top
%d bloggers like this: