খাদ্যে বিষ : আইন আছে প্রয়োগ নেই

      No Comments on খাদ্যে বিষ : আইন আছে প্রয়োগ নেই

খাদ্যে বিষ : আইন আছে প্রয়োগ নেই

সভ্যসমাজে খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি একেবারে অকল্পনীয়। কিন্তু আমাদের দেশে এটি নিয়তির লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, কোথায় ভেজাল নেই, সেটি নিয়েই এখন গবেষণা করা দরকার। অনেকে ভেজাল খাদ্যের ভয়ে মানসিকভাবে আতঙ্কগ্রস্ত। জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও চলছে ভেজাল। আমাদের দেশে ভেজালের যে সর্বগ্রাসী আগ্রাসন তাতে মনে করা যেতেই পারে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা সভ্যতার মাপকাঠিতে এদিক থেকে জংলি যুগের চেয়েও পিছিয়ে আছি। কারণ আর যাই হোক, জংলি যুগের অধিবাসীরা ভেজালের মতো ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হওয়ার কথা ভাবতেও পারত না। প্রশ্ন ওঠে, দেশে সরকার, পুলিশ প্রশাসন, আইন-আদালত থাকা সত্ত্বেও ভেজালের দৌরাত্ম্য কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না। ‘নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩’ হয়েছে তাতেও কিছুই এসে যায় না, ভেজালকারীদের দাপট চলছেই। এভাবেই কি চলবে?

মীর আব্দুল আলীম

দেশে আইনের অভাব নেই। আছে শুধু কার্যকর প্রয়োগের অভাব। তাই নয়া আইন হলেও খাদ্যে ভেজাল বন্ধ হয়নি। ‘খাদ্যে ভেজাল রোধে আদালতের নির্দেশ উপেক্ষিত’ ১২ জুনের জাতীয় দৈনিকর প্রধান শিরোনামের সচিত্র প্রতিবেদন তারই অকাট্য প্রমাণ। ছবিতে প্রকাশ্যেই আমে ফরমালিন মেশাচ্ছে কৃষক। ২০১৫ সাল থেকে নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ কার্যকর করা হয়েছে। ১ বছরে এ আইনের কতটা প্রয়োগ হয়েছে। এতটুকুও ভেজাল রোধ হয়নি। রোজা আর মধুমাসে ফলে ফরমালিন ও কারবাইডের দাপটের কথা লিখছে পত্রিকাগুলো। সবকিছুতে এত ভেজাল যে তা রোধ করা যাবে কিনা সে প্রশ্ন সামনে আসে। এ দেশে মাছ, মাংস, দুধ, ফলমূলে ব্যবহৃত হয় ক্ষতিকর ফরমালিন। রঙিন খাবার তৈরিতে ব্যবহার করা হয় সস্তায় প্রাপ্ত কাপড়ের রং, যা মানবদেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর ও ক্যান্সার সৃষ্টিকারী। মুড়ি ভাজতে ইউরিয়া, কলা পাকাতে কার্বাইড, এমনই আরো কত কী। তেল, মসলা, আটা, ময়দা তথা প্রায় প্রতিটি খাদ্যদ্রব্যেই ভেজালের অস্তিত্ব পাওয়া যায়। তাহলে মানুষ কী খাবে? জেনেশুনেই কি বিষ খাব? খাচ্ছে তো। না খেয়ে উপায় কী। দেশের মানুষকে নিরাপদ খাদ্য সরবরাহের দায়িত্ব সরকারের। নিরাপদ খাদ্য আইন করা হয়েছে। এ আইন প্রয়োগ করা হলে ভেজাল রোধ হবে। কিন্তু গত ফেব্রুয়ারি থেকে চলতি মাসেও এ আইনের প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়নি। নিরাপদ খাদ্যের বিষয়টি ‘যেই লাউ সেই কদু’ অবস্থায়ই আছে।

অতিসম্প্রতি খবরের কাগজের প্রথম পাতায় ছাপা হয়েছে একটি খবর। ‘মাছে-ভাতে বাঙালির মাছে ফরমালিন আর ভাতের চালে প্রাণঘাতী ক্যাডমিয়াম!’ বাঙালি মাছ-ভাত খেয়েই বাঁচে। সে জায়গায়ও বিষের ছড়াছড়ি। খাদ্যও যদি অনিরাপদ হয়ে পড়ে তাহলে দেশের মানুষ কী খাবে? এ দেশে নিরাপদ খাবার আদৌ কি আছে? কেবল মাছ-ভাত নয়, সব খাবারই তো ভেজালে ভরা। ভেজাল খেয়ে গোটা জাতি আজ রোগাক্রান্ত। অথচ অতিসহজেই এ দেশকে ভেজালমুক্ত করা সম্ভব। সরকারের সদিচ্ছা নেই তাই দেশ ভেজালমুক্ত হচ্ছে না। ভেজাল রোধে কোনো সরকারই সচেষ্ট নয়। তাই ভেজাল খাদ্যে ভরে গেছে দেশ। আমরা যা খাচ্ছি তার অধিকাংশই ভেজালে ভরা। খাদ্যে যে ভেজাল দেয়া হয় আর ভেজাল যে রোজই খেয়ে যাচ্ছি তা আজ অবুঝ শিশুরাও অবগত। শিক্ষকদের কাছে শিখে তারা ভেজাল বিষয়ে সচেতন হলেও কীই বা করার আছে তাদের। সেদিন রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুলে পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া এক ছাত্রের প্রশ্ন ছিল এমন_ ‘বাবা! কচুতে মাছি, ফলে নেই কেন?’ বাবার কাছে প্রশ্নটা করলেও উত্তরটা কিন্তু তার ঠিকই জানা। স্কুল ছুটির পর ফুটপাত ধরে রিকশার সন্ধানে ছেলে হেঁটে যাচ্ছে বাবার সঙ্গে। পথে ফেরিওয়ালাদের নানা ফল আর সবজির দোকান। লোভনীয় ফলে মাছি ভনভন করার কথা কিন্তু কোথাও মাছি নেই। আজব ব্যাপার হলো, পাশের মহিলা সবজি বিক্রেতার কচুশাকে মাছিরা দৌড়ঝাঁপ করছে। তাই দেখে ওই শিক্ষার্থী বাবাকে এমন প্রশ্ন করে বসে। সে জানে বিষাক্ত ফরমালিন আর কার্বাইডের কারণে মাছি নেই ফলে। পত্রপত্রিকা আর টিভি দেখেও সে এসব জেনেছে। তাই বাবার কাছে ছেলের এমন রহস্যজনক প্রশ্ন। আর ওই শিক্ষার্থীর বাবা ছেলের এমন প্রশ্নের জবাব দিতেও বিব্রত।

বিমানের যাত্রী হয়ে ঢাকা থেকে সিলেটে যাচ্ছিলাম। আকাশে বিমান উড়তেই সামনের সিটে বসা দুই যাত্রীর ফিসফিস শব্দ কানে এলো। গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তাই অনুচিত হলেও কান পেতে শোনার চেষ্টা করলাম। একপর্যায়ে তাদের রসাল বক্তব্যে আমার কৌতূহল আরো বাড়ল। যাত্রীদ্বয় সুশিক্ষিত এবং সচেতন এ বিষয়ে দ্বিধা নেই। কানে আসা ছন্দময় বাক্যটি ছিল এমন_ ‘প্রাণ কি কাড়বে প্রাণ?’ প্রাণ কোম্পানির খাদ্যে ভেজাল তাদের আলোচনার বিষয়বস্তু। প্রাণ কোম্পানির বাজারজাতকৃত খাদ্যে ভেজাল নতুন নয়। অতিসম্প্রতি আন্তর্জাতিক অঙ্গন থেকেও প্রাণের ভেজাল পণ্য নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। কেবল প্রাণ নয়, ভেজালে ছেয়ে গেছে দেশ। কাজে ভেজাল, কথায় ভেজাল, ওষুধে ভেজাল, সর্বোপরি খাদ্যদ্রব্যেও ভেজাল আর ভেজাল। বোধ করি এমন ভেজাল আর কোনো দেশেই নেই। ছোটবেলায় আমার চাচা বলতেন, ‘বাবারে! কম খাবি তো বেঁচে যাবি।’ তার কথা কম খাদ্যে কম ভেজাল আর তাতেই তার দৃষ্টিতে বেঁচে যাওয়া। তিনি বেঁচে নেই কিন্তু তার কথার মর্ম এখন হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছি।
ভাবী, এসব কী হচ্ছে দেশে। সব শেষ হয়ে যাচ্ছে না তো? ষষ্ঠ শ্রেণি পড়ুয়া ছেলেটার মাথার চুলে চোখ পড়তেই চোখ যেন ছানাবড়া। সাদা চুলে আটকে গেল চোখ। অসংখ্য চুলে পাক ধরেছে। ভাগ্নেটার চোখে মোটা পাওয়ারওয়ালা চশমা। বিছানায় কাতরাচ্ছে ক্যান্সারে আক্রান্ত চাচা। খাবারে ভেজালের জন্যই এমনটা হচ্ছে। ভেজাল নেই কোথায়? চিকিৎসায় ভেজাল, কথায় ভেজাল, রাজনীতিতে ভেজাল। কোথাও যেন এক দ- শান্তি নেই। এমন হচ্ছে কেন? আমরা খাবার খাচ্ছি, না বিষ খাচ্ছি? চারদিকে ফরমালিনের জয়জয়কার। মাছ, আম, জাম, কাঁঠাল, তরকারিতে কোথায় নেই এই জীবনহন্তারক ফরমালিন। তেলে ভেজাল, চালে এমনকি নুনেও ভেজাল। কেউ কেউ তো বলেনই বিষেও নাকি ভেজাল। তাই যা হওয়ার নয়, তাই হচ্ছে। কিডনি নষ্ট হচ্ছে, হচ্ছে হাইপ্রেসার, ক্যান্সার আর হার্টস্ট্রোকে অহরহ মরছে মানুষ। আমাদের অতি আদুরে সন্তানরা অকালে ঝরে যাচ্ছে এসব অখাদ্য-কুখাদ্য খেয়ে। প্রতিটি খাবারে মেশানো হচ্ছে বিষ। আর সেই বিষ খেয়ে আমরা আর বেঁচে নেই। জীবিত থেকেও লাশ হয়ে গেছি। এ যেন জিন্দা লাশ। রোগে-শোকে কয়েকটা দিন বেঁচে থাকা এই আর কি। প্রতিনিয়তই তো বিষ খাচ্ছি। কদিন আগে এক বিখ্যাত কলামিস্ট তার লেখায় লিখেছিলেন, ‘আমরা প্রতিজনে, প্রতিক্ষণে, জেনেশুনে করেছি বিষপান।’ আরেকজন লিখেছেন, ‘কত কিছু খাই ভস্ম আর ছাই।’

জাতীয় দৈনিকের শিরোনাম ছিল এমন ‘মাছের বাজারে মাছি নেই, ফলে মাছি নেই’। প্রতিদিন আমরা যে খাবার খাচ্ছি তাতে কোনো এক মাত্রায় বিষ মেশানো আছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আর এ বিষই আমাদের তিলে তিলে মৃত্যুর দিকে ঠেলে নিচ্ছে। কেবল হাসপাতালগুলোয় গেলেই বোঝা যায় কত প্রকার রোগই না এখন মানবদেহে ভর করে আছে। আসলে আমরা জেনেশুনেই বিষ খাচ্ছি। না খেয়ে উপায়ই বা কী? তবে উপায় একটা আছে। না খেয়ে থাকলে এ থেকে যেন নিস্তার মিলবে। কিন্তু তা তো হওয়ার নয়। তাই আমে, মাছে, সবজিতে বিষ মেশানো আছে জেনেও তা কিনে নিচ্ছি। আর সেই বিষ মেশানো খাবারগুলোই সপরিবারে গিলে চলেছি দিনরাত।

ভেজাল ঠেকাতেই বিএসটিআই (বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইন্সটিটিউশন)। জনস্বার্থে প্রতিষ্ঠানটি অতি গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু এ বিভাগটির সুফল আশান্বিত হওয়ার মতো নয়। উদাহরণ হিসেবে বলা যায়, ভেজাল ও অননুমোদিত খাদ্যসামগ্রী উৎপাদন ও বিক্রির দায়ে বিএসটিআই মাঝেমধ্যে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করে। আদায় করে লাখ লাখ টাকা জরিমানাও। কিন্তু তাদের এ কর্মকা- অনেকটাই লোক দেখানোর মতো। ভেজালের দায়ে অভিযুক্ত বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানই জরিমানা পরিশোধের পর সবাইকে ম্যানেজ করে আবারো সেই একই অপকর্মে লিপ্ত হচ্ছে। ভুক্তভোগীরা এর জন্য বিএসটিআইকেই দায়ী বলে মনে করেন। নিধিরাম সর্দারের মতো শুধু মামলা দায়ের ও জরিমানা আদায়ের মধ্যে সীমিত হয়ে পড়েছে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকা। ফলে ভেজালের কারবারিরা ক্রমেই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তাই মাছে মিলছে বিষাক্ত ফরমালিন, ফলে ক্যালসিয়াম কার্বাইড, ইথেফেন, প্রোফাইল প্যারা টিটিনিয়াম (পিপিটি) পাউডার, বিস্কুটসহ বেকারি দ্রব্যে রয়েছে বিষসমতুল্য রং আর মুড়িতে মেশানো হচ্ছে কৃষিকাজে ব্যবহৃত ইউরিয়া সার। এর বাইরেও রয়েছে নানা রাসায়নিক সংমিশ্রণের কারসাজি।

সভ্যসমাজে খাদ্যে ভেজালের বিষয়টি একেবারে অকল্পনীয়। কিন্তু আমাদের দেশে এটি নিয়তির লিখন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, কোথায় ভেজাল নেই, সেটি নিয়েই এখন গবেষণা করা দরকার। অনেকে ভেজাল খাদ্যের ভয়ে মানসিকভাবে আতঙ্কগ্রস্ত। জীবন রক্ষাকারী ওষুধেও চলছে ভেজাল। আমাদের দেশে ভেজালের যে সর্বগ্রাসী আগ্রাসন তাতে মনে করা যেতেই পারে একবিংশ শতাব্দীতে এসেও আমরা সভ্যতার মাপকাঠিতে এদিক থেকে জংলি যুগের চেয়েও পিছিয়ে আছি। কারণ আর যাই হোক, জংলি যুগের অধিবাসীরা ভেজালের মতো ঘৃণ্য কাজে লিপ্ত হওয়ার কথা ভাবতেও পারত না। প্রশ্ন ওঠে, দেশে সরকার, পুলিশ প্রশাসন, আইন-আদালত থাকা সত্ত্বেও ভেজালের দৌরাত্ম্য কেন বন্ধ করা যাচ্ছে না। ‘নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩’ হয়েছে তাতেও কিছুই এসে যায় না, ভেজালকারীদের দাপট চলছেই। এভাবেই কি চলবে?