বগুড়ায় বড় হচ্ছে পুরনো কৃষি যন্ত্রাংশের বাজার

বগুড়ায় বিসিক শিল্পনগরীসহ বিভিন্ন স্থানে কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরির সাত শতাধিক কারখানা রয়েছে। উত্তরাঞ্চলের এ প্রাণকেন্দ্র কৃষি যন্ত্রপাতি শিল্পে নীরব বিপ্লব ঘটিয়ে দিয়েছে বলা হয়। কিন্তু আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে উতরে যেতে না পারায় এ শহরেই বড় হচ্ছে পুরনো যন্ত্রপাতির বাজার। স্থানীয়ভাবে প্রস্তুতকৃত যন্ত্রপাতিতে ভরসা পাচ্ছেন না কৃষকরা। তারা কিনছেন ব্যবহারের ফলে বিকল বিদেশী যন্ত্রের সচল যন্ত্রাংশ।

সরেজমিন ঘুরে দেখা গেছে, শাপলা সুপার মার্কেট, রেলওয়ে হকার্স মার্কেট, গোহাইল রোড, বিআরটিসি মার্কেট এলাকায় বিকল হয়ে যাওয়া পাওয়ার টিলার, শ্যালো মেশিন ও জেনারেটর কেনাবেচা হচ্ছে। পুরনো যন্ত্রাংশের চাহিদা দিন দিন বাড়ছে। কমপক্ষে ১০টি জেলায় এসব যন্ত্রাংশ বিক্রি হয়। এখানে গড়ে উঠেছে পুরনো যন্ত্রাংশের এক বিশাল বাজার।

ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, অচল পাওয়ার টিলার বিক্রি হয় ১৮ থেকে ২২ হাজার টাকায়। যেখানে নতুনের দাম ৯০ হাজার থেকে লক্ষাধিক টাকা। শ্যালো মেশিন ও জেনারেটর বিক্রি হয় ক্ষমতার ভিত্তিতে। তবে বেশি বিক্রি হয় পাওয়ার টিলার ও শ্যালো মেশিনের যন্ত্রাংশ। উত্তরের ১৬টি জেলার পাশাপাশি ঢাকার ধোলাইখাল, চট্টগ্রাম বন্দর এবং যশোর থেকেও সংগ্রহ করা হয় এসব পুরনো মেশিন।

পুরনো যন্ত্রাংশ বিক্রির কমপক্ষে ২০০ দোকান রয়েছে বগুড়ায়। বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রতিটি দোকানে দৈনিক গড়ে ৫ হাজার টাকার যন্ত্রাংশ বিক্রি হয়। অচল মেশিনের যন্ত্রাংশগুলো তারা আলাদা করে বাজারমূল্যের প্রায় অর্ধেক দামে বিক্রি করেন। ১৮ থেকে ২২ হাজার টাকায় পাওয়ার টিলার কিনে তারা আলাদা যন্ত্রাংশ বিক্রি করেন সর্বোচ্চ ৩৫ হাজার টাকায়। একটি সিডি ফোর শ্যালো মেশিন পুরনো কেনা হয় ৪ হাজার টাকায় আর সেটির যন্ত্রাংশ বিক্রি হয় ৮-৯ হাজার টাকায়। তিন অশ্বশক্তির শ্যালো মেশিন কেনা হয় ১ হাজার থেকে ১ হাজার ২০০ টাকায়। এর যন্ত্রাংশগুলো আলাদা করে বিক্রি হয় ৩-৪ হাজার টাকায়।
ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, একেকটি দোকানে ১০-১২ লাখ টাকার পুরনো যন্ত্রাংশ রয়েছে। এসব দোকানে পাওয়ার টিলারের পুরনো ফাল শেফট ১ হাজার ৫০০ টাকায় পাওয়া যায়, যেখানে নতুনের দাম ২ হাজার ৫০০ টাকার বেশি। লোহার চাকা ৪০০ থেকে ৬০০ টাকা আর নতুন কিনতে গেলে ৩ হাজার টাকার বেশি লাগে। কাউন্টার পিনিয়াম ১ হাজার ১০০ আর নতুন প্রায় ১ হাজার ৫০০ টাকা; বিট টায়ার ৫ হাজার, নতুন কিনতে গেলে দাম পড়বে সাড়ে ৬ হাজার টাকা।

এছাড়া পুরনো একটি গিয়ারবক্স বিক্রি হয় ২ হাজার ৮০০ টাকা, নতুন কিনতে লাগে ৪ হাজার ৬০০ টাকা। পাওয়ার টিলারের একটি যন্ত্রাংশ ড্যানিশ বোর্ড পুরনোর ৮০০ আর নতুনের দাম পড়ে ১ হাজার ৮০০ থেকে ১ হাজার ৯০০ টাকা।

এসব যন্ত্রাংশ বগুড়ার কারখানাগুলোয়ও তৈরি হয়। তার পরও কেন মানুষ পুরনো জিনিস কিনছে, এর জবাবে ব্যবসায়ীরা বলেন, কিছু পার্টস লোকাল মেড হয়ে থাকে। কিন্তু পুরনো পার্টস আমদানি করা মেশিনের; ফলে নকল হওয়ার আশঙ্কা থাকে না। আর বিদেশী জিনিসের মান ভালো, দীর্ঘস্থায়ী, দামও কম। শহরের শাপলা সুপার মার্কেটের মুন্না মেশিনারিজের জাহাঙ্গীর আলম জানান, পাওয়ার টিলার নতুনের দাম বেশি। এর কোনো পার্টস নষ্ট হয়ে গেলে সহজে পাওয়া যায় না। পাওয়া গেলেও আসল যন্ত্রাংশের মতো হয় না। কৃষকরা পাওয়ার টিলার নিয়ে ঝামেলায় পড়ে যান। সে কারণেই বগুড়ার এ পুরনো যন্ত্রাংশের চাহিদা বাড়ছে।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুর উপজেলার পোতাজিয়া ইউনিয়ন থেকে পাওয়ার টিলারের চাকা কিনতে আসা মুকুল জানান, বাজারে নতুন টায়ার পাওয়া যাবে। কিন্তু পুরনো টায়ার দীর্ঘস্থায়ী হয়। তাছাড়া পুরনো টায়ারে প্রায় ২ হাজার টাকা সেভ হবে। সার্ভিসও ভালো।

এদিকে নতুনের পাশাপাশি সেকেন্ডহ্যান্ড যন্ত্রাংশের বাজারও যে দিন দিন বড় হচ্ছে, তা বোঝা গেল বগুড়ার পুরনো যন্ত্রাংশের বিক্রেতা ফরহাদ হোসেনের কথায়। তিনি জানান, প্রতিদিন দোকানে গড়ে ১০ হাজার টাকার বেশি বিক্রি হয়ে থাকে। শাপলা সুপার মার্কেটের শামীম মেশিনারিজ প্রোপ্রাইটর শহীদুল হক খন্দকার শামীম জানান, বাংলাদেশ এগ্রিকালচার মেশিনারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন বগুড়া জেলা শাখার প্রায় ৩৫০ সদস্য রয়েছে। এর মধ্যে পুরনো কৃষি যন্ত্রাংশ বিক্রেতা রয়েছে প্রায় ২০০টি। তার হিসাব মতে, প্রতিদিন এখানে কয়েক লাখ টাকার পুরনো যন্ত্রাংশ বিক্রি হয়।
বাংলাদেশ এগ্রিকালচার মেশিনারি মার্চেন্ট অ্যাসোসিয়েশন বগুড়া জেলা শাখার উপদেষ্টা ও সাবেক সাধারণ সম্পাদক আযম টিকুল জানান, পুরনো যন্ত্রাংশের বাজারে কৃষিকাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহার হয়ে থাকে এমন মেশিনের যন্ত্রাংশের চাহিদা বেশি। এতে কৃষকদেরও সাশ্রয় হচ্ছে।

সূত্র- বনিকবার্তা