অভ্যন্তরীণ কৃষি যন্ত্রাংশের ৮০ ভাগ চাহিদা মেটায় বগুড়া

কৃষি যন্ত্রাংশের ৮০ ভাগ চাহিদা মেটায় বগুড়া

অভ্যন্তরীণ কৃষি যন্ত্রাংশের ৮০ ভাগ চাহিদা মেটায় বগুড়া

রাস্তার সরু গলির দু-পাশে ছোট ছোট ঝুপড়ি ঘর। প্রতিটি ঘরেই লোহা-লক্করের ঢুং ঢাং শব্দ। যেখানে কাজ করছেন সনদবিহীন একদল প্রকৌশলী। উৎপাদন করছেন পানির পাম্প, টিউবওয়েল, সেন্টিফিউগাল পাম্প, লাইনার, পিস্টন, শ্যালো ইঞ্জিনের যন্ত্রাংশ, সাইকেল, রিকশা পার্টস, জুট মিলের যন্ত্রাংশ, পিনারসহ নানা ধরনের কৃষি যন্ত্রাংশ। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলীয় বগুড়া শহরের প্রাণকেন্দ্রে সাতমাথা এলাকায় একটি সরু গলিতে গড়ে উঠেছে বিশাল এই শিল্পাঞ্চল। যা বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ কৃষি যন্ত্রপাতি এবং যন্ত্রাংশের শতকরা ৮০ ভাগ চাহিদা মেটায়।

বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির তথ্যমতে, বগুড়ার এই শিল্পাঞ্চলে প্রায় ১ হাজার ছোট, বড় ও মাঝারি মানের কৃষিভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ও ওয়ার্কসপ রয়েছে। যেখানে প্রায় ১ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান। বগুড়ায় তৈরি এসব কৃষি যন্ত্রপাতি বিক্রয় করার জন্য বগুড়া শহরে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি মার্কেট। যেখানে রয়েছে প্রায় ৩০০ টিরও বেশি বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠান। যাদের বার্ষিক বিক্রয় হাজার কোটি টাকার উপরে। বগুড়ার এই শিল্পাঞ্চল দেশের অভ্যন্তরীণ কৃষি যন্ত্রপাতি এবং যন্ত্রাংশের শতকরা ৮০ ভাগ পূরণ করে। এছাড়া পার্শ্ববর্তী দেশগুলোতেও বগুড়ায় তৈরি বেশ কিছু যন্ত্রাংশ রপ্তানি হয় বলে সমিতি সূত্রে জানা যায়।

এসব কারখানায় তৈরি যন্ত্রাংশের মধ্য আরও রয়েছে মিলিং যন্ত্র, সেপার, বোরিং মেশিন, বিভিন্ন ধরনের লেদ মেশিন, পাওয়ার টিলার, ধান ও ভুট্টা মাড়াই মেশিনসহ কৃষি উপকরণাদি।

বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্প মালিক সমিতির সভাপতি ও মেসার্স কামাল মেশিন টুলসের স্বত্ত্বাধিকারী কামাল মিয়া অর্থসূচককে বলেন, স্বাধীনতার পর থেকে এখানকার স্থানীয় কারিগররা চট্টগ্রাম ডকইয়ার্ডসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে ভাঙ্গা জাহাজের লোহা লক্কড়সহ পরিত্যক্ত লোহা সংগ্রহ করে। তারপর এসব লোহা গলিয়ে নানা ধরনের কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয়। এসব যন্ত্রাংশের চাহিদা এখন সারাদেশের কৃষকদের কাছে।

কৃষিভিত্তিক এই শিল্পের ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও নানান সমস্যার কারণে তা দ্রুত এগিয়ে যেতে পারছে না। এসব সমস্যা সমাধান এবং সরকারি সহযোগিতা পেলে এই শিল্প দেশের চাহিদা মিটিয়ে বিদেশে রপ্তানি করে প্রচুর পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব বলে মনে করছেন উদ্যোক্তারা।

বেলাল ইঞ্চিনিয়ারিং ওয়ার্কসের স্বত্ত্বাধিকারী আলাউদ্দিন বেলাল ১৯৯১ সাল থেকে এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত। লায়নার, পিষ্টন, শ্যালো, ডিপ মেশিনের যাবতীয় খুচরা যন্ত্রাংশ তৈরি করেন তিনি। জানতে চাইলে তিনি অর্থসূচককে বলেন, রংপুর, দিনাজপুর, ঢাকা, পটুয়াখালী, বরগুনা এবং খুলনাসহ দেশের প্রায় প্রতিটি জেলাতেই আমাদের কৃষি যন্ত্রাংশের চাহিদা রয়েছে।

কৃষি যন্ত্রাংশের সমস্যার কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, চায়নার যন্ত্রাংশের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় আমরা টিকতে পারছি না। কেননা, চায়নার যন্ত্রাংশ দেখতে আমাদের যন্ত্রাংশের তুলনায় অনেক চকচকে ও মসৃণ। তাই ক্রেতারা আমাদের পণ্যের চেয়ে চায়নার পণ্য কিনতেই বেশি আগ্রহী। তাই দেশে যে সব কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি করা হয় তা আমদানি নিষিদ্ধ করার দাবি জানান তিনি।

বগুড়ার কৃষি যন্ত্রাংশ শিল্প সংশ্লিষ্টরা বলেন, আমরা দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের ভূমিকা রাখলেও এই খাত এখন অবহেলার শিকার। এই শিল্পের জন্য একটি জোন তৈরি করা অনেকদিনের দাবি। আমাদের কারখানায় লোহার যন্ত্রাংশ তৈরি করা হলেও মেটালকে ট্রিটমেন্ট করা হয় না বলে অনেক উৎপাদিত পণ্যের মধ্যে অপূর্ণতা থেকে যায়। হিট ট্রিটমেন্ট-এর অভাবে তার সঠিক স্থায়িত্ব থাকে না। তাই বগুড়ায় একটি হিট ট্রিটমেন্ট (এক ধরনের যন্ত্র) অত্যন্ত জরুরি। সরকার কৃষি খাতে ভর্তুকি দিচ্ছে। যদি এই শিল্পে এরকম কোনো সুবিধা দেওয়া হয়, তাহলে উৎপাদিত কৃষি যন্ত্রপাতির উৎপাদন খরচ কম হবে। কৃষক কম মূল্যে যন্ত্রপাতি পাবে। এছাড়া এই শিল্প কারখানায় চাহিদামতো গ্যাসের সরবরাহ দেয়ার আহ্বান জানান তারা।

সোর্স- অর্থসূচক।

Top
%d bloggers like this: