কৃষি যন্ত্রপাতির ৭৫% মিটছে দেশীয় উৎপাদন থেকেই

2013-01-18-18-42-53-50f997ad3d2e9-untitled-6

গ্রামবাংলায় জমিজমা চাষের কাজে ব্যবহূত পাওয়ার টিলারের গায়ে ‘মেইড ইন বাংলাদেশ’ লেখা দেখে এখন আর বিস্মিত হওয়ার কিছু নেই। দেশের বেশ কয়েকজন উদ্যোক্তা সত্যি সত্যি সেটি করে দেখিয়ে দিয়েছেন। বরং এখন আর এমন কোনো কৃষি যন্ত্রপাতি নেই, যা তাঁরা তৈরি করতে পারেন না।
আর তাই বর্তমানে ডিজেল ইঞ্জিনসহ গুটি কয়েক উন্নত প্রযুক্তির যন্ত্রই আমদানি হয়। বাকি সব কৃষি যন্ত্রপাতি দেশীয় উৎপাদকেরা জোগান দিচ্ছেন। তবে বিরাট সম্ভাবনা নিয়েও সমস্যার বেড়াজালে আটকে থেকে খুব একটা অগ্রসর হতে পারছে না হালকা প্রকৌশল শিল্পের এই অংশটি। বিদেশ থেকে খুচরা যন্ত্রাংশ আনতে মোটা অঙ্কের আমদানিশুল্ক দিতে হয়। কিন্তু বিনা শুল্কে তৈরি যন্ত্রাংশ আমদানি করা যায় বলে চীনা পণ্যের সঙ্গে অসম প্রতিযোগিতায় পড়তে হচ্ছে দেশীয় উৎপাদকদের। এ ছাড়া আছে উচ্চ সুদের ব্যাংকঋণ ও প্রশিক্ষণের অভাব। এসব বাধা দূর করা গেলে আর সরকারের নীতি-সহায়তা পেলে সহজেই এ খাতে বিপ্লব ঘটানো সম্ভব—এমনটাই দাবি করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

দুই যুগ ধরে সারা দেশে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে অসংখ্য কারখানায় কৃষিযন্ত্র ও যন্ত্রাংশ তৈরি হচ্ছে। দেশীয় চাহিদার প্রায় ৭৫ শতাংশ মেটাচ্ছেন ক্ষুদ্র ও মাঝারি এই উদ্যোক্তারা। তবে অর্থের পরিমাণে আমদানি করা পণ্য ও যন্ত্রাংশই বাজারের বড় অংশ দখল করে আছে বলে জানালেন কেউ কেউ।
দেশীয় উৎপাদক প্রতিষ্ঠান পাওয়ার টিলার থেকে শুরু করে সেচযন্ত্র, ধান-গম কাটার যন্ত্র, ধান মাড়াই ও ঝাড়াই যন্ত্র, গম মাড়াই, ভুট্টা মাড়াই, ধান-গম শুকানোর যন্ত্র, নিড়ানি যন্ত্র ইত্যাদি তৈরি করছে। প্রতিষ্ঠানগুলো রাজধানীর পুরান ঢাকা, সিলেট, কিশোরগঞ্জ, বগুড়া, দিনাজপুরসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় বিক্ষিপ্তভাবে গড়ে উঠেছে।

সিলেটের আলীম ইন্ডাস্ট্রিজ দেশীয় কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদনে পরিচিত একটি নাম। যদিও শুরুর দিকে তারা চা বাগানের যন্ত্রপাতি তৈরি করত। তবে নব্বইয়ের দশকে চা-শিল্পের পড়তি দেখে কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি শুরু করেন প্রয়াত এম এ আলীম চৌধুরী। তাঁর হাতে গড়া এই প্রতিষ্ঠানটিই প্রথম দেশি মাড়াইকল উদ্ভাবন করে। এর স্বীকৃতি হিসেবে ১৯৯২ সালে রাষ্ট্রপতি পুরস্কার পায় আলীম ইন্ডাস্ট্রিজ।

বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটি প্রায় সব ধরনের কৃষি যন্ত্র তৈরি করছে। সমঝোতা চুক্তির আওতায় বারি, বিরিসহ তিনটি প্রতিষ্ঠান তাঁদের কাছ থেকে ফরমায়েশ দিয়ে চাহিদামতো কৃষি যন্ত্রপাতি তৈরি করিয়ে নেয়। গত বছর প্রায় ৩০ কোটি টাকার যন্ত্রপাতি বিক্রি হয়েছে বলে জানালেন এক কর্মকর্তা। আলীমের কারখানায় কাজ করেন ৩৫০ শ্রমিক-কর্মচারী।

বগুড়ার ছিলিমপুরে নব্বইয়ের দশকে কামাল মেশিন টুলস নামে কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরির একটি কারখানা প্রতিষ্ঠা করেন মো. কামাল মিয়া। শুরুতে পাওয়ার টিলারের বিভিন্ন যন্ত্রাংশ তৈরি করলেও এখন হ্যান্ড টিউবয়েল, গম ও ধান মাড়াই যন্ত্র, ঘাস কাটার যন্ত্র, ঝাড়াইসহ অনেক ধরনের যন্ত্র উৎপাদন করছে প্রতিষ্ঠানটি।

সম্প্রতি পল্লী উন্নয়ন বোর্ডের সঙ্গে যৌথভাবে রেইজ গ্রেড নামে নতুন যন্ত্র তৈরি করছেন বলে জানালেন কামাল মিয়া। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাংলাদেশে আমরাই এটি প্রথম করলাম। যন্ত্রটি দিয়ে জমি চাষের পাশাপাশি স্বয়ংক্রিয়ভাবে বীজও বোনা হয়ে যাবে।’
বিদেশি পণ্যের ও যন্ত্রাংশের শুল্কের মধ্যকার ব্যবধানের কারণে স্থানীয় উদ্যোক্তারা সবচেয়ে বেশি সমস্যায় পড়ছেন। কেননা, কৃষি যন্ত্র বিদেশ থেকে শুল্কমুক্তভাবে আমদানি করতে পারেন ব্যবসায়ীরা। কিন্তু উদ্যোক্তাদের দেশে যন্ত্র তৈরির জন্য খুচরা যন্ত্রাংশ আমদানিতে প্রায় ২৩ শতাংশের বেশি শুল্ক ও কর দিতে হয়।

আলীম ইন্ডাস্ট্রিজের ব্যবস্থাপনা পরিচালক আলীমুল এহছান চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, ‘ডিজেল ইঞ্জিনসহ বেশকিছু যন্ত্রাংশ আমাদের আমদানি করতে হয়। তবে উচ্চ শুল্কের কারণে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এতে দেশি পণ্যের দাম বেড়ে যায়। আর এটি পরোক্ষভাবে কৃষকের ঘাড়েই এসে পড়ে। তখন ফসলের উৎপাদনখরচ বাড়ে।’ তিনি বলেন, ‘দেশে উৎপাদিত পাওয়ার টিলারের দাম ৭০ থেকে ৭৫ হাজার টাকা। কিন্তু যন্ত্রাংশ শুল্কমুক্ত হলে এটি ৫০ থেকে ৫৫ হাজার টাকায় দেওয়া সম্ভব।’ এ ক্ষেত্রে বন্ডেড ওয়্যার হাউসের সুবিধা দেওয়ার দাবি করেন তিনি।
এহছান চৌধুরী আরও বলেন, ‘কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি করলে কৃষি মন্ত্রণালয় আমাদের বলে, আমরা শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে। আবার শিল্প বলে, আমরা কৃষি মন্ত্রণালয়ের অধীন। এই দোটানায় পড়ে আমদের উচ্চসুদে ঋণ নিতে হচ্ছে। কিন্তু কৃষি যন্ত্রাংশ তৈরি করার কারণে আমাদের ব্যাংকঋণের সুদের হার এক অঙ্কের হওয়ার কথা।’

বাংলাদেশ ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পমালিক সমিতির সভাপতি আবদুর রাজ্জাক বলেন, কৃষি যন্ত্রপাতি উৎপাদন খাতে উন্নতি করতে হলে হালকা প্রকৌশল শিল্পের জন্য পরিকল্পিত শিল্পনগর স্থাপন করতে হবে। যেখানে সব ধরনের সুবিধা বিদ্যমান থাকবে। একই সঙ্গে পুঁজি, প্রযুক্তি, নীতি-সহায়তা ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। এ জন্য প্রয়োজনে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সঙ্গে নিয়ে হলেও সরকারকে এগিয়ে আসা উচিত।’ তবে দীর্ঘদিন ধরে সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে শিল্পনগর স্থাপনে দেনদরবার করেও কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করেন।

আবদুর রাজ্জাক আরও বলেন, ‘আমরা এখনো সনাতনী প্রযুক্তি ব্যবহার করি। এ দিয়ে যতটুকু সম্ভব অগ্রগতি ইতিমধ্যে হয়ে গেছে। আরও সামনে এগোতে হলে শিগগিরই যুগোপযোগী ব্যবস্থা নিতে হবে। এটি সম্ভব হলে দেশের চাহিদা মিটিয়ে কৃষি যন্ত্রপাতি বিদেশে রপ্তানি করা যাবে।’

Top