কৃষি বিপন্ন হলে গোটা দেশের বিপদ

কৃষি মূলগত ভাবে পাল্টে যাচ্ছে। আগে কৃষিতে যে শক্তির প্রয়োগ হত তার গোটাটাই প্রায় ছিল ভারবাহী পশুশক্তি এবং মানুষের পেশিশক্তি। এখন দেশে কৃষিতে যে শক্তির ব্যবহার হয় তার বড়জোর পাঁচ শতাংশ পশুশক্তি, আরও পাঁচ শতাংশ মানুষের পেশিশক্তি, বাকিটা যন্ত্রশক্তি।

যখন লাঙ্গল করা, গাড়ি টানা, ঘানি এবং পারসিক জলচক্র ইত্যাদির সাহায্যে সেচের কাজে পশুশক্তির বহুল ব্যবহার চালু হয়, তখন বিশুদ্ধ আর্থনীতিক কারণেই গোমাংস ভক্ষণের উপর কিছু নিষেধাজ্ঞা জারি হয়। আজকের পরিবর্তিত অবস্থায় কৃষি ও পশুপালনের মধ্যেকার সম্পর্ক একটা সংকটের মধ্যে পড়েছে। আগে চাষিদের ঘরে এঁড়ে বাছুরগুলোকে নির্বীজকরণ করে বলদ হিসেবে রেখে দেওয়া হত। যেহেতু কৃষিতে বলদের চাহিদা ছিল বিপুল, এঁড়ে বাছুরেরও মর্যাদা ছিল সমধিক। এখন কৃষিতে পশুশক্তির ব্যবহার খুবই কম, ফলে বলদের সেই চাহিদাও এখন অতীত। এঁড়ে গরুগুলোর কী হবে?

কাণ্ডজ্ঞান বলে, গোহত্যা বা গোমাংসভক্ষণে নিষেধাজ্ঞা জারি করা যে আইনগুলো বিভিন্ন রাজ্যে রয়েছে, এখন ভেবে দেখা দরকার যে সেগুলোর আর কোনও প্রয়োজন আছে কি না। কিন্তু হচ্ছে তার উল্টোটা— গোরক্ষার নামে যে তান্ডব চলছে তা সামাজিক ক্ষেত্র ছাড়াও কৃষিক্ষেত্রেও গভীর সংকট ডেকে আনছে।

ষাটের দশকে আমরা অনেকেই মনে করতাম যে, কৃষকের হাতে জমি দিলেই সব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ১৯৭৭-৭৮ সালে যখন খাসজমি বণ্টন হল, তখন বিলি করার জন্য পাওয়া জমির তুলনায় প্রাপকের সংখ্যা এত বেশি ছিল যে দেখা গেল অনেক জমিতে লাঙ্গলই ঘোরে না— কোদাল দিয়ে চাষ করতে হয়। যখন অ-কৃষক মালিকদের হাতে জমি ছিল, সেই সময়ের তুলনায় এই ব্যবস্থায় গোটা রাজ্যেই প্রভূত উৎপাদন বাড়ল, কিন্তু সেটা বিঘা-প্রতি উৎপাদনের হিসেবে। শ্রমদিবস পিছু উৎপাদনের হার খুব একটা বাড়ল না। সেই উৎপাদনের হার বৃদ্ধির জন্য কৃষিতে যন্ত্রশক্তির বিপ্লবটি খুবই প্রয়োজন ছিল।

বর্ণাশ্রম না ভেঙে, ভূমিসংস্কার না করেই ষাটের দশকে ভারতের রাষ্ট্রনায়করা সবুজ বিপ্লবের কথা ভেবেছিলেন। গোড়ায় গলদ। কিন্তু, অস্বীকার করা যাবে না যে তাঁরা কৃষির উন্নয়নে রাষ্ট্রের ভুমিকার কথাটিকে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন। প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল হলেও, রাষ্ট্র কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগ করেছিল। কৃষি গবেষণার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা হয়েছিল। গবেষণার ফসল চাষিদের হাতে পৌঁছে দেওয়ার জন্য বহু বীজ-খামার গড়ে তোলা হয়েছিল। ভারতের কৃষি-অর্থনীতির ক্ষেত্রে এই খামারগুলির গুরুত্ব অনেক।

১৯৯০ দশকের গোড়ায় কেন্দ্রীয় সরকার উল্টো পথে হাঁটতে শুরু করে। কৃষিক্ষেত্রে বিনিয়োগ বন্ধ হল। কৃষি গবেষণার কাজ নাকি করবে বহুজাতিক সংস্থাগুলো। তারাই সরবরাহ করবে বীজ, সার, কীটনাশক ও যন্ত্রপাতি। এই সংস্কার কর্মসূচির দু’ দশক পরে আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের কৃষি এখন হাতে গোনা কয়েকটি বিদেশি বহুজাতিকের মুখাপেক্ষী। কিছু দিন আগে দুটি বড় বহুজাতিক সংযুক্ত হয়ে এক দৈত্যাকার একচেটিয়া ব্যবসায়িক সংস্থার জন্ম হল। সেটা দুনিয়ার বীজ ও কীটনাশকের বাজারের বিপুলাংশই নিয়ন্ত্রণ করবে, ভারতে তাদের প্রায় কোনও প্রতিদ্বন্দ্বীই থাকবে না। এই একচেটিয়া ক্ষমতাকে তারা ব্যবহার করবে বীজ-সার-কীটনাশকের দাম যথেচ্ছ বাড়িয়ে কৃষকদের লুন্ঠন করার কাজে। এর নীট ফল দাঁড়াবে আরও কৃষকের আত্মহত্যা, আর খাদ্য উৎপাদনে আমরা যেটুকু স্বয়ম্ভরতা অর্জন করতে পেরেছি, তা-ও হারানো।

এই আগ্রাসন থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একমাত্র রাস্তা কৃষিক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগ বৃদ্ধি করা, দেশের চাহিদা ও আবহাওয়ার সঙ্গে সংগতি রেখে বীজ তৈরি করা, বীজ খামারে সে সব বীজের কার্যকারিতা পরীক্ষা করা, পরীক্ষিত বীজ কৃষকদের সরব্রাহ করা, এবং চাষিদের উৎপন্ন ফসল  ন্যায্যমূল্যে কিনে নেওয়া। এ জন্য যেমন প্রচুর কৃষি-গবেষণাগার লাগবে, তেমনই প্রয়োজন হবে অনেক কৃষি খামারের।

ষাটের দশকে যে সব কৃষি খামার গড়ে তোলা হয়েছিল, তাদের মধ্যে একটি ছিল গোয়ালতোড়ে। সেই খামারে এখনও বীজের জন্য কিছু পরিমাণে চাষ হয়, যদিও  এর অন্তর্গত এক হাজার একর জমিকে যে-ভাবে বীজ উৎপাদনের জন্য ব্যবহার করা সম্ভব ছিল, সেটা করা হয়নি। অথচ, গোয়ালতোড়কে ঘিরে প্রচুর আলুর চাষ হয়, এবং প্রায়ই খারাপ বীজের কারণে উৎপাদন বিপর্যয় ঘটে। এই খামারটিকে ব্যবহার করে আলু বীজের সমস্যাটাকে ভাল ভাবে মোকাবিলা করা যেত।  রাজ্যের আরও অনেক বীজ খামারকে এই রকম নিষ্ফলা ফেলে রাখা হয়েছে, সেগুলিকেও কৃষির উন্নতিতে কাজে লাগানো যেত। বামফ্রন্ট জমানাতেই গোয়ালতোড় কৃষি খামার বন্ধ করে দেওয়ার চিন্তা-ভাবনা শুরু হয়। ২০১১ তে নতুন সরকার আসার পর এটিকে শিল্প উন্নয়ন নিগমের হাতে তুলে দেওয়া হয়েছে, এবং এই জমি ‘ল্যান্ড-ব্যাঙ্কের’ অন্তর্ভুক্ত বলে দাবি করা হচ্ছে।

১৯৮০-র দশকে আংশিক ভূমিসংস্কার ছিল বামফ্রন্টের সাফল্য। কিন্তু সেই সাফল্যকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হলে কৃষির উন্নয়নে মনোযোগ দিতে হত। ছোট ছোট ভূমিখণ্ডকে একত্র করার জন্য সমবায় গঠন করা যেত, এবং রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপে কৃষির আধুনিকীকরণের উদ্যোগ নেওয়া যেত। সীমিত ক্ষমতার মধ্যেও যেটুকু করা যেত, বামফ্রন্ট সেটাও করতে বিফল হয়। আবার বাম-রাজত্বের শেষ দিকে কৃষির আধুনিকীকরণের দায়িত্বটা বহুজাতিকদের হাতে তুলে দেওয়ার উদ্যোগ চলে, যদিও সে-প্রস্তাব তখন কার্যকর হয়নি। এখন তৃণমূল সরকার সেই চুক্তি চাষের পথেই এগোবে বলে ঘোষণা করেছে। প্রস্তাবে ঈষৎ নতুনত্ব আছে, কিন্তু অন্তর্বস্তুতে এটা ঔপনিবেশিক যুগের নীলচাষের থেকে আদৌ আলাদা নয়।

এই পথে, রাজ্যের উন্নয়নের নামে যে ভাবে কৃষি ও শিল্পকে পরস্পর-বিরোধী হিসাবে তুলে ধরা হচ্ছে, শিল্পস্থাপনের অগ্রাধিকার প্রমাণ করার জন্য কৃষিকে যে ভাবে অবহেলা করা হচ্ছে, এবং লুটেরাদের হাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে, তার পরিণাম মারাত্মক হতে বাধ্য। শিল্পের প্রয়োজন  অনস্বীকার্য, কিন্তু শিল্পায়নের প্রক্রিয়াতে কৃষিকে বিস্মৃত হওয়া চলে না। ইউরোপের যে উদাহরণ তুলে ধরা হয়, সেখানে কিন্তু শিল্পের পাশাপাশি কৃষিরও আধুনিকীকরণ ঘটেছিল। মুলত কৃষির চাহিদা মেটাতে গড়ে তোলা হয়েছিল রাসায়নিক শিল্প। চিলিতে প্রশান্ত মহাসাগর উপকূল জুড়ে শত শত বছর ধরে জমা হওয়া বাদুড়ের মল থেকে গড়ে উঠেছিল সোডিয়াম নাইট্রেটের পাহাড়, কেমিস্ট্রি বইতে যাকে বলা হয় চিলি সল্টপিটার। নিখরচায় পেয়ে যাওয়া সেই উর্বরকের ব্যবহার করে ইউরোপ কৃষি উৎপাদনে বিপ্লব ঘটিয়ে ফেলে ।

ভারতে কৃষি যে সংকটে পড়েছে তা থেকে বেরোতে গেলে রাষ্ট্রকে কৃষিতে বিনিয়োগ করতেই হবে, রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে চাষিদের উন্নত বীজ সরবরাহ করতে আরও অনেক নতুন খামার গড়ে তুলতে হবে। সে কাজটা সহজ নয়, কারণ বীজ খামার করতে জমি লাগে। তাই রাজ্যের হাতে যে বীজ খামারগুলি আছে তার জমি অন্য কাজে ব্যবহার করাটা সামাজিক দৃষ্টিতে অত্যন্ত অদূরদর্শিতার কাজ হবে।

কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে কিছু আশা করা বৃথা। সে সরকার এক দিকে গো-রক্ষার নামে সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ ঘটাবে, আর অন্য দিকে গোটা কৃষি-ব্যবস্থাটাকে বহুজাতিক একচেটিয়া পুঁজির হাতে তুলে দেবে।

রাজ্যের হাতে ক্ষমতা সীমিত, কিন্তু সেই ক্ষমতাটুকুও বিচক্ষণতার সঙ্গে ব্যবহার করে নতুন দিশা দেখানো যায়। কিন্তু প্রবণতাটি যদি হয় শিল্পের দোহাই দিয়ে পুঁজির একাগ্র আরাধনা, তা হলে কৃষকের সঙ্গে সারা দেশের ভাগ্য-বিপর্যয় এড়ানো কঠিন।

সুত্রঃ আনন্দবাজার

Top
%d bloggers like this: