পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পোকার চাষ!

পুষ্টির চাহিদা মেটাতে পোকার চাষ!

নিত্য নতুন খাবার আবিষ্কার হচ্ছে, কিন্তু সেসব খাবারে প্রকৃত পুষ্টি পাচ্ছে না মানুষ। তাই বিজ্ঞানীরা বলছেন, খুব শিগগিরই ইউরোপে পোকা চাষের ফার্ম চালু হবে। পোকা ছাড়া কোনোভাবেই পুষ্টির চাহিদা পূরণ হওয়া সম্ভব নয়। কারণ, শুককীট বা ল্যাদা পোকায় প্রচুর পরিমাণে প্রোটিন আছে, যা মানুষের পুষ্টির চাহিদা মেটাবে।

জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার তথ্যানুসারে ২০০০ সালে মাংস বা প্রোটিনের চাহিদা যা ছিল, তা থেকে ২০৩০ সাল নাগাদ প্রায় ৭২ ভাগ বেড়ে যাবে। আর তখন প্রোটিনের চাহিদা পূরণে হিমসিম খেতে হবে মানুষকে। বর্তমানে পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে বিভিন্ন প্রাণীর মাংস খাই আমরা। কিন্তু তথন এমন পরিস্তিতি সৃষ্টি হবে যে প্রাণীর মাংসেও পুষ্টির চাহিদা পূরণ করতে পারবে না। তাই বাধ্য হয়েই পোকা মাকড়ের উপর নির্ভরশীল হবে মানুষ।

২০১৩ সালেও জাতিসংঘ থেকে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনেও টেকশই পুষ্টি চাহিদা পূরণের জন্য পোকা চাষের প্রতি ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ঘাস ফড়িং, পিঁপড়া ও অন্যান্য পোকামাকড় চাষ করে পুষ্টি চাহিদা পূরণ করা সম্ভব। তবে পোকা চাষের ব্যাপারে সতর্কতা অবলম্বন করা দরকার। যেসব পোকামাকড় পরিবেশের ক্ষতি করে না সেগুলো চাষ করতে হবে। আর এদিকে অন্যান্য প্রোটিনের উৎস যেমন মাছ ও মাংসও সচল রাখতে হবে।

গত বছরে ইউরোপিয়ান ইউনিয়নও এক প্রতিবেদনে ক্রমবর্ধমান পুষ্টি চাহিদা পূরণ করতে পোকা চাষের ব্যাপারে উৎসাহিত করেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ‘পুষ্টির চাহিদা পূরণের জন্য পোকা খাওয়ার বিষয়টি এলিয়েন কালচার মনে হলেও এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার প্রায় ২ মিলিয়ন মানুষের প্রধান প্রোটিনের উৎস এই পোকামাকড়। এই পোকামাকড়গুলোর মধ্যে শুঁয়োপোকা, উইপোকা, ঘাস ফড়িং, ঝিঁঝিঁ, অরুচিকর বাগ এবং অন্যান্য পোকামাকড় খুব জনপ্রিয়। কিন্তু এসব পোকামাকড় সেখানে কোনো ফার্মে চাষ হয় না। ওইসব অঞ্চলের মানুষ প্রাকৃতিকভাবে পোকা সংগ্রহ করে খায়।’

ইউরোপে এখন যে পোকামাকড়ের ব্যবহার হয় না তা কিন্তু নয়। তবে মানুষের খাবার হিসেবে ব্যবহার হয় কমই। সাধারণত বাসার পোষা প্রাণীর জন্য তারা এসব পোকা কেনেন এবং সেগুলোকে পোষেন। তবে যে পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে তাতে এবার মানুষের খাবারের জন্য পোকার চাষ শুরু হবে। এবং এটি মাছ ও মাংসের বিকল্প হিসেবে ব্যবহার হবে। তার মধ্যে শুককীট, বা উড়ন্ত পোকা খুবই উপযুক্ত বিকল্প হিসেবে মনে করছেন গবেষকরা।

ইতিমধ্যেই ইউরোপিয়ান কমিশন ‘প্রোটইনসেক্ট’ নামের এক প্রজেক্ট চালু করেছে। এই প্রজেক্টের কাজ হলো কোন কোন প্রাণী বা পোকা মানুষের পুষ্টির জন্য বেশি উপযোগী ও পরিবেশের কোনো ক্ষতি করে না, তা গবেষণা করে বের করা।

‘প্রোটইনসেক্ট’ ও ‘মিনেভরা কমিউনিকেশন ইউকে’ এক সাথে কাজ করছে। মিনেভরা কমিউনিকেশনের এক মুখপাত্র বলেন, ‘ইউরোপের নীতিমালায় কোন পোকামাকড় খাওয়া বা পালন করার ব্যাপারে আইন আছে। তবে সম্প্রতি পোকা চাষের যে কথা উঠেছে তাকে আমরা খুবই উদ্বিঘ্ন। কারণ আবার সব নীতিমালা পরিবর্তন করতে হবে। কোন কোন পোকা ফার্মে চাষ করা যাবে আর কোনগুলো যাবে না তা নির্ধারণ করতে হবে ইত্যাদি ইত্যাদি।’

তবে পোকা চাষের ব্যাপারে সবচেয়ে যে বিষয় নিয়ে সবাই সবচেয়ে উদ্বিগ্ন তা হলো- মানুষের স্বাস্থ্য ঝুঁকি। কারণ, এখনও অনেক বিশেষজ্ঞ মনে করছেন, কিছু পোকা আছে যেগুলো মানুষের খাওয়া ‍উচিত নয়। সেগুলো মানুষের পাকস্থলী হজম করতে পারবে না, বা স্বাস্থ্যের ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে।

তবে ইউরোপীয় খাদ্য নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ (ইএফএসএ) এই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছে। তারা বলছেন, অন্যান্য প্রাণীর মাংস যেভাবে প্রক্রিয়াজাত করা হয়, ঠিক সেভাবেই পোকা প্রক্রিয়াজাত করা হবে। সুতরাং এখানে ক্ষতির কোনো সম্ভাবনা নেই। আর মানুষের পুষ্টির চাহিদাও পূরণ হবে।

তাই ইউরোপিয়ান কমিশন তাদের ‘প্রোটইনসেক্ট’ প্রোজেক্টের ডাটা-গুলি আবার যাচাইবাছাই করছে। ডাটা-গুলির উপর নির্ভর করবে কত তাড়াতাড়ি আবার পোকার ফার্ম চালু করা যায়। যদি তারা মনে করেন, পোকা চাষ করা সম্ভব- তাহলে খুব শিগগিরই পোকা চাষের ফার্ম চালু করা হবে।