কালীগঞ্জে ফুল চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে

ফুল ছাড়া কি প্রিয় মানুষকে হৃদয়ের জমে থাকা ভালোবাসার কথা ব্যক্ত করা যায়! হৃদয়ে জমে থাকা সেই ভালোবাসা ফুল ছাড়া যেন অসম্পন্নই থেকে যায়। প্রিয় মানুষটিকে মূল্যবান কোনো উপহার দিতে পারুক আর নাই পারুক ছোট্ট একটি ফুল তুলে দিয়ে প্রকাশ করতে পারে হৃদয়ের গভীর ভালোবাসার কথা। তাইতো ভালোবাসা প্রকাশের মহামূল্যবান ফুলটি দেশের অগণিত তরুণ-তরুণীসহ সকল বয়সের মানুষের হাতে তুলে দিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন ঝিনাইদহের ফুলকন্যারা। প্রতিবছর বসন্ত বরণ, ভালবাসা দিবস, বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষ, স্বাধীনতা দিবস ও আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের মতো দিনগুলোতে ফুলের অতিরিক্ত চাহিদা থাকে। আর এই চাহিদার সিংহভাগ যোগান দিয়ে থাকে ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার ফুল চাষিরা। যার কারনে দিন দিন কালীগঞ্জে ফুল চাষ বৃদ্ধি পাচ্ছে।

বিশেষ করে কালীগঞ্জ উপজেলার ১২টি গ্রামের ২৩৮ একর জমিতে এখন চাষ হচ্ছে গাঁদা, রজনীগন্ধ্যা, গোলাপ ও গ্লাডিয়াসসহ নানা জাতের ফুল। মাঠের পর মাঠ হলুদ গাদা ফুলের দৃশ্য দেখে চোখ জুড়িয়ে যায়। বিশ্ব ভালবাসা দিবস উপলক্ষে এ জেলার ফুলচাষীরা কয়েক কোটি টাকার ফুল বিক্রির টার্গেট নিয়েছে।

এসব ফুল ক্ষেত থেকে সংগ্রহ ও মালা গাঁথা থেকে শুরু করে বিক্রি করা পর্যন্ত এই এলাকার মেয়েরা করে থাকে। ফলে পুরুষের পাশাপাশি মেয়েদেরও কর্মসংস্থান হচ্ছে। এ এলাকার উৎপাদিত ফুল প্রতিদিন দূরপাল্লার পরিবহনে চলে যাচ্ছে ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বড় বড় শহরগুলোতে। জাতীয় ও বিশেষ দিনগুলো ছাড়াও সারাবছর এ অঞ্চলের উৎপাদিত ফুল সারাদেশের চাহিদা মেটাতে ভূমিকা রাখে।
কথা হয় জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার ছোট্র একটি গ্রাম ডুমুর তলার চাষী মশিয়ার রহমানের সাথে। তিনি জানান, উপজেলার বিভিন্ন স্থানে ফুল চাষ দেখে তিনি কৃষি বিভাগের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে ২০ শতক জমিতে গাদা ফুল চাষ করেছেন। বাংলা আশ্বিন মাসে চারা গালানোর পর ৩৫ থেকে ৪৫ দিনের মাথায় ফুল এসেছে। গত এক সপ্তাহে তিনি ১০ হাজার টাকা ফুলও বিক্রি করেছেন। সার,কীটনাশক,পরিচর্যা বাবদ তার খরচ হয়েছে ১০ হাজার টাকা। এই ২০ শতক জমি থেকে তিনি ৫০ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করতে পারবেন বলে জানান। এতে তার লাভ থাকবে ৪০ হাজার টাকা।

এছাড়া এই গাছ যতœ করে রাখলে বিভিন্ন সময়ে ফুল তুলতে পারবেন। তিনি আরো জানান, দড়িতে ফুল গেথে ঝোপা তৈরি করা হয়। এক ঝোপায় সাড়ে ৬শ থেকে ৭শ গাদা ফুল থাকে। ফুলের মূল্য কম থাকলে এক ঝোপা বিক্রি হয় ৩০ টাকায়। দাম বাড়লে সর্বোচ্চ ৭শ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে পারেন। আরেক চাষী মোহাম্মদ আলী জানান, তিনি আগাম গাদা ফুল চাষ করে মাত্র ১১ শতক জমি থেকে ৬০ হাজার টাকার ফুল বিক্রি করেছেন। এছাড়া একই গ্রামের মহাসিন, আতিয়ার ও মিজানুর রহমানও তাদের জমিতে ফুল চাষ করেছেন।

ফুলনগরী বলে খ্যাত বড়ঘিঘাটি গ্রামের ফুলকন্যা নাজমা, নুরজাহান, স্বরসতী ও আয়েশা বেগমের জানান, বছরের বারো মাসই ফুল তোলার কাজ করেন তারা। কিন্তু বিশেষ বিশেষ দিন সামনে রেখে কাজ বেশি করতে হয়। আয় উপার্জন ও বেশি হয়। তারা জানান, এখন ভালোবাসা দিবস উপলক্ষে সকাল বিকাল কাজ করতে হচ্ছে। ব্যপারীরা ফুল নিতে ফুল মালিকের বাড়ি বসে থাকছে। যে কারণে সব কিছু রেখে সারাদিন ফুল তুলছেন তারা।

তারা আরও জানান, প্রতি ঝোপা ফুল তুলে গেঁথে দিলে ফুল মালিক ১০ টাকা করে দেয়। প্রতিদিন তারা ১২ থেকে ১৮ ঝোপা ফুল তুলতে পারে। অনেকে আবার স্থানীয় এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে একটি বাড়ির কাজ ও গৃহপালিত পশু কেনে। এরপর ফুলের কাজ করে কিস্তির টাকা পরিশোধ করি। এভাবেই এ এলাকার প্রায় প্রতি বাড়ির নারীরা এই কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত। যে কারণে এই এলাকার মানুষ দিনে দিনে এখন বেশ স্বচ্ছল হয়ে উঠছেন।

উপ-সহকারি কৃষি কর্মকর্তা মতিয়ার রহমান জানান, শুধুমাত্র কালীগঞ্জ উপজেলায়ই ২৩৮ একর জমিতে ফুল চাষ হচ্ছে। এছাড়া জেলার প্রায় ৫ শত হেক্টর জমিতে চাষ করা হয়েছে গ্লাডিয়াস, রজনীগন্ধ্যা গোলাপ, গাঁদাসহ নানা জাতের ফুল। উৎপাদন ব্যয় কম, আবার লাভ বেশি হওয়ায় কৃষকরা ফুল চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। কালীগঞ্জ উপজেলার কামালহাট, খড়িকাডাঙ্গা, দৌলতপুর, কাদিরডাঙ্গা, বিনোদপুর, খালকোলা, বালিয়াডাঙ্গা, দাদপুর, ধলা, গোপিনাথপুর, ডুমুরতলা,বালিয়াডাঙ্গা, তিল্লা, সিমলা, রোকনপুর, গোবরডাঙ্গা, পাতবিলা, পাইকপাড়া, তেলকূপ, গুটিয়ানী, সদর উপজেলার গান্নাসহ বিভিন্ন গ্রামের মাঠে ফুল চাষ করা হয়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি গাধা ফুল চাষ হয় কালীগঞ্জ উপজেলার কামালহাট গ্রামে।
সরেজমিনে বালিয়াডাঙ্গা বাজার ও কালীগঞ্জের মেইন বাসস্ট্যান্ডে দেখা যায়, দুপুর থেকে শত শত কৃষক তাদের ক্ষেতের উৎপাদিত ফুল ভ্যান, স্কুটার ও ইঞ্জিনচালিত বিভিন্ন পরিবহন যোগে নিয়ে আসছেন। বেলা গড়ানোর সাথে সাথে বালিয়াডাঙ্গা বাজার ও কালীগঞ্জ মেইন বাসস্ট্যা- ভরে যায় লাল, সাদা আর হলুদ ফুলে ফুলে।

সারাদেশের আড়তগুলোতে ফুল পাঠাতে আসা একাধিক ফুলচাষিদের সঙ্গে আলাপ করে জানা গেছে, সারা বছরই তারা ফুল বিক্রি করে থাকেন। তবে প্রতিবছর বাংলা ও ইংরেজি নববর্ষের দিন, স্বাধীনতা দিবস, আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস, ভালবাসা দিবস প্রভৃতি দিনগুলোতে ফুলের অতিরিক্ত চাহিদা থাকে। এ সময় দামও থাকে ভালো। ফুলচাষিরা নিজেরা না এসে সারা বছর তাদের ক্ষেতের ফুল চুক্তি মোতাবেক ঢাকা, চট্টগ্রাম, সিলেটসহ দেশের বড় বড় শহরের ফুলের আড়তে পাঠিয়ে দেন। এ সকল স্থানের আড়তদারেরা বিক্রির পর তাদের কমিশন রেখে বাকি টাকা পাঠিয়ে দেন। ফলে ফুল চাষিদের টাকা খরচ করে ফুল বিক্রির জন্য কোথাও যাওয়া লাগেনা। তারা মোবাইল বা ফোনালাপের মাধ্যমে বাজার দর ঠিকঠাক করে ফুল পাঠিয়ে থাকেন বলেও জানান কৃষকরা।

দেশের অর্থনীতিতে ভূমিকা রাখলেও দ্রুত পঁচনশীল এ ফসল সংরক্ষণের জন্য নেই কোনো ব্যবস্থা। ফলে যখন বাজারে যোগান বৃদ্ধির কারণে হঠাৎ দাম কমে যায় তখন লোকসানে বিক্রি করা ছাড়া উপায় থাকে না ফুলচাষিদের। ফলে কৃষকেরা বঞ্চিত হন ন্যায্যমূল্য থেকে।

বালিয়াডাঙ্গা গ্রামের ফুলচাষি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক জানান, ১৯৯১ সালে এ এলাকায় সর্বপ্রথম ফুল চাষ করেন বালিয়াডাঙ্গার ছব্দুল শেখ। তিনি ওই বছর মাত্র ১৭ শতক জমিতে ফুল চাষ করে স্থানীয় বিয়ে, সামাজিক অনুষ্ঠান ও জাতীয় দিবসগুলোতে ক্ষেত থেকেই বিক্রি করে প্রায় ৩৪ হাজার টাকা লাভ করেছিলেন। এরপর থেকে এ চাষ বিস্তার লাভ করতে থাকে। ধান পাট সবজি প্রভৃতি ফসলের চাষ করে উৎপাদন ব্যয় বাদ দিলে খুব বেশি একটা লাভ থাকে না। কিন্তু ফুল চাষ করলে আবহাওয়া যদি অনুকূলে থাকে তাহলে যাবতীয় খরচ বাদে প্রতি বিঘায় ৪০ থেকে ৬০ হাজার টাকা লাভ করা সম্ভব। ফলে দিন যত যাচ্ছে এ অঞ্চলে বৃদ্ধি পাচ্ছে ফুল চাষ।

স্থানীয় ফুলচাষি সমিতির সাধারণ সম্পাদক ফজলুর রহমান জানান, এলাকার কৃষকরা কষ্ট ফুল উৎপাদন করলেই প্রায়ই তারা ন্যায্য মূল্য থেকে বঞ্চিত হয়। মধ্যভোগী ব্যবসায়ীরা কম দামে কিনে অনেক লাভবান হয়। কিন্তু ফুল সংরক্ষণের কোনো ব্যবস্থা না থাকায় বাধ্য হয়ে কৃষকরা কম দামে তাদের হাতে ফুল তুলে দেয়।

Leave a Reply

Top
%d bloggers like this: