সফল কৃষি উদ্যোক্তা পারভিন ও আলেয়া

সফল কৃষি উদ্যোক্তা পারভিন ও আলেয়া

অসহায় বিধবা পারভিন আজিজ বাঁচার পথ খুঁজতে মাত্র পাঁচ হাজার টাকার পুঁজি নিয়ে ব্যবসায় নেমেছিলেন। তার নিষ্ঠা ও কঠোর পরিশ্রমে সেই ব্যবসার মূলধন আজ ১০ লাখ টাকায় পৌঁছেছে। সফল কৃষি উদ্যোক্তার স্বীকৃতি হিসেবে তাকে ব্যবসায়িক সহযোগিতা দিয়েছে ইউএসএআইডি (ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট)। সংস্থাটির অর্থায়নে পদ্মার এ পারের ২০ জেলার তিন হাজার কৃষি উদ্যোক্তাকে সিএনএফএ’র (কালটিভেটিং নিউ ফ্রন্টিয়ার ইন অ্যাগ্রিকালচার) মাধ্যমে ব্যবসায়িক সুবিধা দেয়ার প্রকল্প গ্রহণ করেছে। যশোরের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাঁচতে শেখা বৃহত্তর যশোর, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও রাজবাড়ী জেলায় প্রকল্পটি বাস্তবায়নে কাজ করছে।

পারভিন আজিজের বাড়ি ঝিনাইদহ শহরের ব্যাপারীপাড়ায়। তিনি বীজের ব্যবসায় করেন। তার ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটি শহরের অগ্নিবীণা সড়কে। দুই অবুঝ সন্তান নিয়ে তিনি বিধবা হয়েছেন ২৮ বছর আগে। স্বামীর মৃত্যুতে অসহায়ের মতো বসে থাকেননি। ঝাঁপিয়ে পড়েন স্বামীর পেশা বীজের ব্যবসায়। ২০ বছর আগে এক বোনের মেয়ের দেয়া মাত্র পাঁচ হাজার টাকা নিয়ে যে ব্যবসায় শুরু করেন, তা আজ ১০ লাখ টাকার পুঁজির ব্যবসায়ে পরিণত হয়েছে।

তিনি জানান, মাত্র ১৩ বছর বয়সে ১৯৮০ সালে তার বিয়ে হয়। তাদের সংসারে দু’টি সন্তান আসার পর স্বামী আজিজুর রহমান ১৯৮৭ সালে মারা যান। তখন বয়স যেমন কম তেমনি ঘরকন্নার অভিজ্ঞতার বাইরে তিনি কিছুই জানতেন না। এ অবস্থায় ভেঙে পড়েননি তিনি। ভাবেন দোকানে বসে ব্যবসায় করতে হবে। পুরুষেরা পারলে তিনি পারবেন না কেন। সাহস করে তিনি নেমে পড়েন কাজে। স্বামীর পেশায় মিশে গেলেন। তিনি যখন এগিয়ে গেলেন কিছুটা তখন তার এক ভাই ১৫ হাজার টাকা দেন। এই টাকায় চলতে থাকে ব্যবসায়।

তিনি এতটাই পরিশ্রম করেছেন যে, মওসুমে ভোর ৬টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত একনাগাড়ে দোকানদারি করেছেন। বর্তমানে ৪৮ বছর বয়সেও তিনি এখনো দোকানদারি করেন। সকালে রান্নাবান্নার কাজ শেষ করে সময়মতো ঝিনাইদহ শহরের অগ্নিবীণা সড়কের ‘ঝিনাইদহ নার্সারি অ্যান্ড বীজ ভাণ্ডার’ নামের দোকানে এসে বসেন। বাসায় ফেরেন রাতে। দুপুরে দোকানেই খান। ছেলে পাভেল রহমান বাসা থেকে খাবার নিয়ে আসে। ছেলেটি স্নাতক পর্যন্ত লেখাপড়া করে এখন মায়ের সাথে ব্যবসায় দেখেন।

পারভিন জানান, তার দোকানে সব ফসলের উন্নতমানের বিদেশী বীজ পাওয়া যায়। তিনি জামালপুর সিডস, গেটকো সিডস ও খুলনা সিডস এর পরিবেশক। বীজের নির্ভরযোগ্যতা থাকায় ক্রেতাও বেশি। মওসুমে প্রতিদিন লাখ টাকার ওপর বেচাকেনা হয়। এতে লাভ থাকে হাজার টাকারও বেশি।

রাসেল আহমেদ নামে তার বড় ছেলেটি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। পাভেল ও তার স্ত্রীসহ তিনজনের সংসার এখন তাদের। সুখেই আছেন।

পারভিন আজিজ উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্ত লেখাপাড়া জানেন। তিনি এই বীজ ব্যবসায়কে কেন্দ্র করে দুইবার থাইল্যান্ড সফরের সুযোগ পেয়েছেন। ২০০৯ সালে জামালপুর সিড কোম্পানির ব্যবস্থাপনায় সাত দিনের সফরে যান। গত ১১ মে তারিখে ১০ দিনের প্রশিক্ষণে যান সিএনএফএ’র ব্যবস্থাপনায়। তিনি কৃষি উদ্যোক্তা হিসেবে এক হাজার ডলার (৭৭ হাজার ৫০ টাকা) মূল্যের ব্যবসায়িক সহযোগিতা (নগদের পরিবর্তে উপকরণ) পেয়েছেন।

বাঁচতে শেখার পরিচালক পলাশ হিউবাড জানান, ট্রেড লাইসেন্সসহ কৃষি উপকরণের ব্যবসায় আছে, বেচা-কেনার হিসাব রাখার মতো ন্যূনতম লেখাপড়া জানেন এবং সিএনএফএ’র দেয়া ব্যবসায়িক সহযোগিতার সমপরিমাণ অর্থ বিনিয়োগে সক্ষম এমন কৃষি উদ্যোক্তাকে ব্যবসায়িক সহযোগিতা প্রদান করা হয় এই প্রকল্পের মাধ্যমে।

পারভিন আজিজের মতো সিএনএফএ’র স্বীকৃতিপ্রাপ্ত আর এক সফল কৃষি উদ্যোক্তা হলেন যশোর সদর উপজেলার নাটুয়াপাড়া গ্রামের আলেয়া খাতুন। তিনি স্নাতক পাস করে প্রথমে মুদি ব্যবসায় শুরু করেন। পরে ব্যবসার পরিসর বাড়িয়ে কৃষি উপকরণের দোকান দিয়েছেন।

তিনি জানান, তার বাবার ছেলে সন্তান নেই. তাই তাকে বিয়ে দিয়ে বাড়িতে রেখেছেন। তিনি বাবার ছেলের অভাব পূরণের ভূমিকা রাখতে নিজেই শুরু করেছেন ব্যবসায়। এই ব্যবসায় করে তার অন্য তিন বোনকে উচ্চশিক্ষায় শিক্ষিত করেছেন। সংসারের বড় খরচের জোগান তিনিই দেন। তিনিও সফল কৃষি উদ্যোক্তা হিসিবে ৭৭ হাজার ৫০ টাকা মূল্যের ব্যবসায়িক সহযোগিতা পেয়েছেন।

বাঁচতে শেখার প্রশাসনিক প্রধান হিমেল সঞ্জিত কিসকু জানান, পদ্মার এ পারের ২০ জেলার তিন হাজার কৃষি উদ্যোক্তাকে ইউএসএআইডি’র অর্থায়নে সিএনএফএ ২৩ কোটি ১১ লাখ ৫০ হাজার টাকা মূল্যের ব্যবসায়িক সহযোগিতা দেবে। এর মধ্যে ৭০০ পুরুষ ও ৩০০ মহিলা। যশোরের বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা বাঁচতে শেখা যশোর, ঝিনাইদহ, মাগুরা, নড়াইল, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর ও রাজবাড়ী জেলায় প্রকল্প বাস্তবায়নে কাজ করছে। এ সংস্থার ব্যবস্থাপনায় ১০৮ জন নারী কৃষি উদ্যোক্তাকে সহযোগিতা দেয়া হবে।